বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিংবদন্তি ‘কিলো ফ্লাইট’ কমান্ডার ও সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) সুলতান মাহমুদের (বীর উত্তম) তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালন করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।
এ উপলক্ষে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বাদ জুমা বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটি ও ইউনিটের মসজিদে তার জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন নোয়াখালী (বর্তমানে ফেনী) জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তার বাবা নূরুল হুদা এবং মা আনকুরেন্নেছা বেগম।
তিনি ঢাকার আরমানিটোলা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সারগোদার পিএএফ পাবলিক স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ১৯৬২ সালে রিসালপুরের পিএএফ একাডেমি থেকে এফএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার স্টাফ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
সুলতান মাহমুদ ১৯৬০ সালের ১৯ আগস্ট তৎকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৬২ সালের ১ জুলাই জিডি (পি) শাখায় কমিশন লাভ করেন। চাকরিকালে তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশাগত কোর্সে অংশ নিয়ে সফলতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করেন।
১৯৭১ সালে দেশপ্রেমের অদম্য চেতনায় মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ। পাকিস্তান বিমানবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ২ নম্বর সেক্টরে স্থলযুদ্ধে অংশ নেন। পরে ১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্থলযুদ্ধে রামগড় থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তিনি অসংখ্য দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। চট্টগ্রামের মদুনাঘাটে বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ধ্বংস করে ওই এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা ছিল তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য অভিযানগুলোর একটি। এ সময় তিনি শত্রুর গুলিতে ডান হাঁটুতে আহত হন।
পরবর্তীতে সুস্থ হয়ে ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে নবগঠিত ‘কিলো ফ্লাইট’-এর অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন। পাইলট ইন কমান্ড হিসেবে ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে অ্যালুয়েট-থ্রি হেলিকপ্টারে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপোতে হামলার মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রথম বিমান আক্রমণ অভিযানের সূচনা করেন।
তার নেতৃত্বে ‘কিলো ফ্লাইট’ স্বল্পসময়ে মোট ৫০টি সফল বিমান অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে সুলতান মাহমুদ সরাসরি ২৫টি অভিযানে অংশ নেন। এসব অভিযান শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসের পাশাপাশি তাদের মনোবল দুর্বল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতার জন্য তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮১ সালের ২৩ জুলাই তিনি বিমানবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৭ সালের ২৩ জুলাই বর্ণাঢ্য কর্মজীবন থেকে অবসর নেন।
মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে সুসংগঠিত ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশ গঠনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৮’-এ ভূষিত করে।
২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট নিজ বাসভবনে ৭৯ বছর বয়সে মারা যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) সুলতান মাহমুদ। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।