গোলাপি রঙের জার্সির মায়ায় বুঁদ গোটা ফুটবল বিশ্ব। বুয়েনস এইরেস থেকে বার্সেলোনা; সবার দেয়ালেই শোভা পাচ্ছে মায়ামির সেই ফ্লেমিংগো গোলাপি।তবে ইন্টার মায়ামির এই বিশ্বজোড়া খ্যাতির পেছনে ক্লাবের চেয়ে বড় ভূমিকা লিওনেল মেসির জাদুকরি নামের।
এমন অসংখ্য মানুষ যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের রাস্তায় মায়ামির জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যাদের মায়ামি শহরের সঙ্গে কোনো সরাসরি যোগসূত্রই নেই।একই দৃশ্য ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও; আল-নাসরের হলুদ জার্সির পেছনে ছুটছেন তার ভক্তরা।
আধুনিক ফুটবল দ্রুত এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে সমর্থকরা ক্লাবের চেয়ে একক খেলোয়াড়ের পেছনে ছুটতেই বেশি পছন্দ করেন।
স্পোর্টস ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিস্ট জেমস কার্কহ্যামের মতে, নতুন প্রজন্মের সমর্থকরা অতীতের মতো নির্দিষ্ট ক্লাবের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত বা ‘ট্রাইবাল’ নন। ইএ স্পোর্টস এফসি বা ফুটবল ম্যানেজারের মতো ভিডিও গেম খেলে তাদের মধ্যে বিশ্ব ফুটবলের এক বিশ্বকোষীয় জ্ঞান তৈরি হয়েছে।ইউটিউব এবং ট্রেডিং কার্ডও এই মানসিকতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
গেমের আলটিমেট টিমে ভক্তরা যে খেলোয়াড়দের কেনেন ও খেলেন, তাদের সঙ্গেই তৈরি হয় মানসিক সংযোগ। ফলে প্রিয় খেলোয়াড় রিয়াল মাদ্রিদ, আতলেতিকো মাদ্রিদ, চেলসি কিংবা ডর্টমুন্ড; যে ক্লাবেই যাক না কেন, ভক্তরা সেই জার্সিতেই খেলোয়াড়ের নাম দেখতে চান। ক্লাব সেখানে নিতান্তই একটি উপলক্ষ।
এরিক ক্যান্টোনার বিখ্যাত উক্তি ছিল, জীবনে সবকিছু বদলানো গেলেও ফুটবল দল বদলানো যায় না। কিন্তু সাম্প্রতিক সমীক্ষা ভিন্ন কথা বলছে। ‘দ্য রাইজ অব দ্য সেকেন্ড ক্লাব ফ্যান’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ ফুটবল সমর্থক এখন তাদের আজীবনের মূল দলের পাশাপাশি একটি ‘দ্বিতীয় ক্লাব’ অনুসরণ করেন।
বিশেষ করে যেসব দেশে শক্তিশালী ঘরোয়া লিগ নেই, সেখানকার ভক্তদের জন্য এটা আরও স্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে তারা ক্লাবের ঐতিহ্য বা জার্সির রঙ দেখে দ্বিতীয় দলকে পছন্দ করেন, তবে সবচেয়ে বড় কারণ প্রিয় খেলোয়াড়ের দলবদল। অর্থাৎ খেলোয়াড় যেখানে যান, ভক্তদের সমর্থনও সেখানে চলে যায়।
খেলোয়াড়রা এখন আর শুধু ক্লাবের প্রচারণার ওপর নির্ভরশীল নন। ২০১৮ সালে আতোয়াঁ গ্রিজম্যান যখন ‘দ্য ডিসিশন’ নামক তথ্যচিত্রের মাধ্যমে আতলেতিকোতে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন তা সমালোচিত হলেও এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। আর্লিং হালান্ড, জুড বেলিংহ্যাম কিংবা ইংল্যান্ড নারী দলের এলা টুন; সবাই নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি কনটেন্ট বানাচ্ছেন।
হ্যারি কেইন তৈরি করেছেন নিজস্ব অ্যাপ ‘ক্লিটস ক্লাব’, যার মাধ্যমে তিনি সরাসরি ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর দেন। কার্কহ্যামের ভাষায়, ‘খেলোয়াড়রা এখন অনেক বড় সাংস্কৃতিক প্রতীক। করোনাকালে খাদ্যনীতি নিয়ে মার্কাস রাশফোর্ডের লড়াই রাজনীতি পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল। তরুণ ভক্তরা এমন খেলোয়াড়কে চায়, যিনি কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ধারণ করেন।’
এবারের বিশ্বকাপ আবারও প্রমাণ করেছে তারকার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের শক্তি। ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে ইনস্টাগ্রামে প্রায় ২ কোটি বেশি ফলোয়ার থাকা আর্লিং হালান্ড নরওয়ের হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছেন। মাত্র দেড় মাসে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৫ কোটির বেশি নতুন ফলোয়ার যুক্ত হয়েছে।
হালান্ডের খোলামেলা স্বভাব, রসিক মিম ও সক্রিয় উপস্থিতি তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। একই চিত্র স্পেনের তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল বা ইংল্যান্ডের বেলিংহ্যামের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়, তারকা খেলোয়াড় চলে গেলে ক্লাবগুলো কি সেই সমর্থকদের ধরে রাখতে পারে?
দক্ষিণ কোরিয়ার সন হিউং-মিন যখন এক দশক পর টটেনহ্যাম হটস্পার ছেড়ে লস অ্যাঞ্জেলেস এফসিতে যোগ দেন, তখন স্পার্সের বিপুল কোরিয়ান সমর্থক একবারে হারিয়ে যাননি, তবে নতুন ক্লাবের ফলোয়ার লাফিয়ে বেড়েছে। একই ঘটনা ঘটছে মোহামেদ সালাহ লিভারপুলের সোনালী অধ্যায় শেষে তুরস্কের ট্রাবজোনস্পোরে যোগ দেওয়ার পরও।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন তারকাকে ক্লাব সবসময় ধরে রাখতে পারবে না। তবে তারা থাকাকালীন ‘বিহাইন্ড দ্য সিন’ বা মাঠের পেছনের জীবনের চমৎকার সব কনটেন্ট তৈরি করে ক্লাবগুলো নিরপেক্ষ ভক্তদেরও নিজেদের সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারে। যেমনটা হলিউড তারকা রায়ান রেনল্ডস দেখিয়েছেন তার রেক্সহ্যাম ক্লাবের মাধ্যমে। আধুনিক ফুটবল এখন কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়, বরং এটি এক জমজমাট ড্রামা বা রিয়্যালিটি শো; যার মূল চরিত্র খেলোয়াড়রাই।
– বিবিসি হতে অনূদিত