‘আজ অনেকের কাছে ২১ জুলাই একটি সাধারণ দিন। কিন্তু আমাদের জন্য এই দিনটি কোনোদিনই সাধারণ হবে না।গত বছরের এই দিনে আমাদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। সেই আগুন, সেই আর্তনাদ, সেই অসহায় মুহূর্ত- আজও আমরা প্রতিদিন বয়ে বেড়াচ্ছি।’
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে আহত শিক্ষার্থী জায়ানা মাহবুবের মা সানজিদা বেলায়েত কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, গত এক বছর ধরে আহত শিশু ও তাদের পরিবার প্রতিনিয়ত এক কঠিন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সানজিদা বেলায়েত বলেন, দুর্ঘটনায় শুধু কয়েকটি প্রাণ হারায়নি, হারিয়ে গেছে অসংখ্য স্বপ্নও।যারা মারা গেছে, তারা প্রত্যেকেই মেধাবী ছিল এবং একদিন দেশের সম্পদ হতে পারতো।
নিজের মেয়ে জায়ানার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর টানা ৪২ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। তখন মনে হয়েছিল হাসপাতাল থেকে ফিরলেই বুঝি সব শেষ হবে। কিন্তু পরে বুঝেছেন, প্রকৃত যুদ্ধ তখনই শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, আহত শিশুরা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও মারাত্মক ট্রমার মধ্যে রয়েছে। তাদের আচরণ বদলে গেছে, অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। এই পরিবর্তনের প্রভাব পুরো পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে।
আমার মেয়েটা খুবই শান্ত, ভদ্র ও অন্যের বিপদে এগিয়ে আসতে ভালোবাসতো। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন সে টিচার্স রুমে একা আটকে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা তার মানসিক জগৎকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন তার মনে হয় পৃথিবীতে কেউ কারও নয়- বলেন তিনি।
তিনি বলেন, মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘ সময় কাউন্সেলিং করাতে হয়েছে। আজও মাঝে মধ্যে সে আগুনে পোড়া গন্ধ অনুভব করে এবং সেই দিনের স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরে।
হাসপাতালের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সানজিদা বেলায়েত বলেন, আহত শিশুদের যন্ত্রণা কাছ থেকে দেখে তার মনে হয়েছে, একজন মা হিসেবে এর চেয়ে কঠিন কষ্ট আর হতে পারে না।
এ সময় তিনি তাসনিয়া হকের মায়ের সঙ্গে হাসপাতালের একটি স্মৃতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাসনিয়ার মা আমাকে বলেছিলেন, আল্লাহ যদি তার মেয়ের কষ্ট কমিয়ে দেন, তাহলে মৃত্যুকেও তিনি মেনে নেবেন। একজন মা কখন এমন কথা বলেন, তা ভাবলেও বুক কেঁপে ওঠে।
আহত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্থায়ী স্বাস্থ্য কার্ডের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি। একইসঙ্গে নিহত ও আহত পরিবারের জন্য ঘোষিত ক্ষতিপূরণ পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, একটি শিশুর জীবন, একজন শিক্ষকের আত্মত্যাগ কিংবা একজন মায়ের জীবনের মূল্য কোনো অর্থ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
একজন মা হিসেবে ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সানজিদা বেলায়েত। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের শরীরে দাগ রয়ে গেছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় দাগ তৈরি হয়েছে তাদের মনে। সমাজ যেন ভবিষ্যতে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, আমাদের অনেক সন্তান আগের মতো পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। তারা মানসিক অস্থিরতায় ভুগছে। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।
এ সময় তিনি নিহত শিশু, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য দোয়া চান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান।