‘এক বছর আগে ঠিক এই সময় আমি দাঁড়িয়েছিলাম জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। চারদিকে শুধু পোড়া শিশুদের আর্তনাদ, স্বজনদের কান্না আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই।সেই স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।’
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে অনুষ্ঠিত শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলছিলেন মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থী তাসনিয়া হকের বাবা মো. নাজমুল হক।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও মেয়েকে হারানোর শোক যেন এতটুকুও কমেনি।
তিনি বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠানে এসে স্মৃতিচারণ করা একজন বাবা-মায়ের জন্য কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
‘আমরা কী হারিয়েছি, সেটা কাউকে বুঝিয়ে বলা যাবে না। একটা বছর পার হয়ে গেছে।কিন্তু প্রতিটি দিন আমাদের কাছে একই রকম কষ্টের।’
তিনি জানান, এই এক বছরে নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সরকারি সহায়তা নিয়ে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
‘আমরা চাই, সরকার নিহত পরিবারগুলোর জন্য সম্মানজনক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করুক। আহত শিশুদের উন্নত চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করুক।’
নাজমুল হক বলেন, দুর্ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন। খবর পেয়ে ছুটে যান হাসপাতালে। সেখানে যে দৃশ্য দেখেছিলেন, তা কোনো বাবার পক্ষে ভুলে থাকা সম্ভব নয়।
‘আমার মেয়ে তাসনিয়া, মায়া আর তাসকিয়া একই শ্রেণিতে পড়তো। হাসপাতালে গিয়ে দেখি, ছোট ছোট বাচ্চাদের হাত-পায়ের চামড়া উঠে গেছে। সেই বীভৎস দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
তিনি বলেন, এরপর আহত শিশুদের কেউ বার্ন ইনস্টিটিউটে, কেউ সিএমএইচে ভর্তি হয়। প্রতিটি শিশুই তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিল।
‘আমি নিজের চোখের সামনে একের পর এক শিশুকে চলে যেতে দেখেছি। নাজিয়ার মৃত্যুর সময় আমি হাসপাতালেই ছিলাম। মনিটরে ওর সব সংকেত একে একে নিভে যাচ্ছিল। আমি ডাক্তারকে বলেছিলাম, ওকে আইসিইউতে নিন। তখন ডাক্তার শুধু বলেছিলেন, ‘ও আর বাঁচবে না।’
কথা বলতে বলতে থেমে যান তিনি।
‘এই মৃত্যুর মিছিলের শেষ নাম ছিল আমার মেয়ে তাসনিয়া। এক মাস তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তাসনিয়ার শেষ ইচ্ছার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
‘তাসনিয়া বারবার বলতো—আব্বু, মায়া তো হাসপাতালে আছে। আমাকে একবার ওর কাছে নিয়ে চলো। হুইলচেয়ারে করে হলেও নিয়ে যাও। কিন্তু আমি তাকে বলতে পারিনি, মায়া এরই মধ্যে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।’
সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েন মেয়ের শেষ কথাগুলো স্মরণ করতে গিয়ে।
‘মৃত্যুর আগে তাসনিয়া শুধু একটা কথাই বারবার বলত—বাবা, তোমাদের সঙ্গে আর কিছুদিন থাকতে চাই। এই কথাটা মনে পড়লে কোনো বাবা কীভাবে নিজেকে সামলে রাখবে?’
তিনি বলেন, নিহত শিশুদের কবর যেন স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে রাষ্ট্র সবসময় দাঁড়ায়- এটাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
এ সময় তিনি আহত শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিশ্চিত করারও দাবি জানান।
তিনি বলেন, আবিদ, রোহান, নাবিদ, আফিফ, রূপীসহ অনেক শিশু এখনো ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে আছে। তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আমি শুধু চাই, আমাদের শহীদ সন্তানদের সবাই মনে রাখুক। ওরা যেন তাদের বন্ধুদের মাঝেই বেঁচে থাকে। আল্লাহ যেন সব শহীদ শিশুকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আর যারা এখনো চিকিৎসাধীন, আল্লাহ তাদের দ্রুত সুস্থতা দান করুন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যেন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে— আপনাদের কাছে এটাই আমাদের একমাত্র আবেদন।