যেভাবে কোহিনূর হীরা নিয়ে বিতর্ক উসকে দিলেন নিউইয়র্কের মেয়র

যেভাবে কোহিনূর হীরা নিয়ে বিতর্ক উসকে দিলেন নিউইয়র্কের মেয়র

লন্ডন টাওয়ারে সংরক্ষিত রত্নগুলোর মধ্যে এটি হয়ত সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে দামি নয়, কিন্তু কোহিনূরের মতো ইতিহাস আর কোনো হীরার নেই।

ধারণা করা হয়, এই হীরার উৎস দক্ষিণ ভারতে।কোহিনূরের ইতিহাস মূলত এই উপমহাদেশে এক বিশাল অস্থিরতার সাক্ষী। শত শত বছর ধরে যুদ্ধ, সহিংসতা এবং হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এটি মুঘল সম্রাট, পারস্যের আক্রমণকারী এবং শিখ রাজাদের হাতবদল হয়েছে।সবশেষে ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এটি ছিনিয়ে নেয়।

গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাজ্য এই রত্নটি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।তবে গত সপ্তাহে কোহিনূরের সেই অস্থির ক্ষমতা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

রাজা তৃতীয় চার্লসের নিউইয়র্ক সফরের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে শহরটির মেয়র জোহরান মামদানিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ব্রিটিশ রাজার সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পেলে তিনি কোন বিষয়টি বেছে নেবেন।

জবাবে মামদানি বলেছিলেন, ‘আমি যদি রাজার সঙ্গে কথা বলি… তবে সম্ভবত আমি তাকে কোহিনূর হীরাটি ফেরত দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করব।’

তার এই মন্তব্য বেশ বিস্ফোরক প্রমাণিত হয়েছে। নিউইয়র্ক পোস্ট মেয়রের সমালোচনা করে বলেছে, তার মন্তব্যগুলো ‘অশালীন’ এবং এতে ‘পরিপক্কতা, সৌজন্য ও বিনয়ের অভাব’ রয়েছে। কিন্তু পুরো ভারতজুড়ে মামদানির এই বক্তব্যকে উদযাপন করা হয়েছে। এটি কোহিনূর ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিকে আবারও চাঙ্গা করেছে। হীরাটি বর্তমানে প্রয়াত রানি মাতার মুকুটে বসানো রয়েছে।

পরে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে মামদানির সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি উঠেছিল কি না, তার কোনো সুনিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, মামদানির মা একজন বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং তার বাবা উগান্ডার একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত, যিনি উপনিবেশবাদ নিয়ে গবেষণা করেন।

তবে ‘কোহিনূর: দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ইনফামাস ডায়মন্ড’-এর সহ-লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল বলেছেন, নিউইয়র্কের মেয়র কোহিনূরের প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসায় তিনি অবাক হননি।

ডালরিম্পল বলেন, ‘মানুষকে বুঝতে হবে যে কোহিনূর এখনও একটি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ বিষয়। লন্ডনের কাঁচের আলমারিতে রাখা এই একটি ছোট পাথরের ওপর দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ উপনিবেশবাদের সমস্ত বেদনা উগরে দেয়।’

ইতিহাসখ্যাত এই পাথরটিকে ঘিরে পুরুষদের জন্য একটি অভিশাপের গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয়, শত শত বছর ধরে এর পুরুষ মালিকরা হত্যাকাণ্ড, অসুস্থতা বা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। ব্রিটিশরা এটি দখল করার পর গত দেড়শ বছরে এটি কেবল ব্রিটিশ রানিরাই পরিধান করেছেন, কোনো রাজা নয়।

বর্তমানে ডালরিম্পল হীরাটিকে ‘উপনিবেশিক লুটতরাজের একটি পকেট-সাইজ প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা এখনও এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে।

তিনি আরও বলেন, ‘রাজা চার্লস যখন তার মার্কিন সফরে ট্রাম্প এবং কংগ্রেসকে সামলে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে রয়েছেন, ঠিক তখনই কোহিনূর বিতর্ক তাকে বিড়ম্বনায় ফেলেছে। এটি যুগের পর যুগ, বংশ পরম্পরায় চলতেই থাকে।’

ডালরিম্পল এবং তার সহ-লেখক অনিতা আনন্দের গবেষণায় দেখা গেছে, কোহিনূরকে ঘিরে থাকা অনেক পৌরাণিক কাহিনী স্রেফ একজন ব্রিটিশ আমলা তৈরি করেছিলেন। ৫শ বছরেরও বেশি সময় ভারত শাসন করা মুঘলদের কাছে এটি সবচেয়ে বড় বা কিংবদন্তি হীরা ছিল না, এমনকি তাদের রত্ন তালিকায় এর নামও ছিল না।

বরং এটি মুঘল সম্রাট শাহজাহানের বিশাল ময়ূর সিংহাসনে বসানো অনেক মূল্যবান রত্নগুলোর মধ্যে একটি ছিল। ১৭৯৩ সালে পারস্যের শাসক নাদের শাহ এটি লুট করেন। তিনি হীরাটি বর্তমান ইরানে নিয়ে যান এবং এর নাম দেন ‘কোহিনূর’, যার অর্থ ‘আলোর পাহাড়’। এরপর তিনি এটি জনসমক্ষে প্রদর্শন করতে শুরু করেন।

নাদের শাহের হত্যাকাণ্ডের পর কোহিনূর আফগানিস্তানে যায়। এরপর এটি আবার ভারতীয় উপমহাদেশে ফিরে আসে যখন পাঞ্জাবের শিখ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রঞ্জিত সিং এটি নিজের অধিকারে নেন। তিনি গর্বের সঙ্গে নিজের বাহুতে হীরাটি পরিধান করতেন। সিং-এর মৃত্যুর পর এটি তার শিশু উত্তরাধিকারী দুলীপ সিং-এর দখলে আসে।

কিন্তু ১৮৪৯ সালে যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহিংসভাবে পাঞ্জাব দখল করে, তখন তারা ১০ বছর বয়সী এই শিশু শাসককে লাহোর চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। কোহিনূর রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া ছিল এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত, যা সমালোচকদের মতে চাপের মুখে করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

ডালরিম্পল জোর দিয়ে বলেন, এটি একটি বড় পরিহাস যে ব্রিটিশরাই কোহিনূরকে সাম্রাজ্যের শৌর্যের প্রতীক হিসেবে মহিমান্বিত করেছিল। হীরাটি নেওয়ার পর রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে উপস্থাপন করা হয় এবং জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। এরপর ইউরোপীয় রুচি অনুযায়ী এটি ভুলভাবে কাটা হয় যেন তা মুকুটে মানানসই হয়। এভাবেই এটি ব্রিটিশ রাজকীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়।

তবে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর এই লুণ্ঠিত রত্নটি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠতে শুরু করে। ভারত সরকার গত কয়েক দশকে বেশ কয়েকবার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। কোহিনূর এখন আন্তর্জাতিকভাবে উপনিবেশিক লুণ্ঠনের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

প্রচুর ভারতীয় পর্যটক লন্ডন টাওয়ারে যান বিশেষভাবে কোহিনূর দেখতে। হীরাটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই পর্যটকদের ‘চোর, চোর’ চিৎকার করতে শোনা যায়।

তবে একের পর এক ব্রিটিশ সরকার এই রত্ন ফেরত দেওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, এটি একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়েছে। ২০১০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, কোহিনূর ফেরত দিলে ব্রিটিশ মিউজিয়াম খালি হয়ে যাবে।

তবে এর বিতর্কিত অবস্থানের কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েই প্রথা ভেঙে রাজা তৃতীয় চার্লসের রাজ্যাভিষেকে কোহিনূর ব্যবহার করা হয়নি।

বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে অন্যান্য দেশের দাবি। কোহিনূরের ওপর কেবল ভারত নয়, ১৯৭০-এর দশকে পাকিস্তানও দাবি জানিয়েছিল এই যুক্তিতে যে এটি লাহোর থেকে নেওয়া হয়েছে। দেশভাগের পর লাহোর এখন পাকিস্তানে। এছাড়া বাংলাদেশ, আফগানিস্তান এমনকি তালেবান নেতারাও এর দাবি জানিয়েছেন।

ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে যেমনটা উল্লেখ করেছেন, কোহিনূরের মালিকানা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ‘ব্রিটিশরা কার কাছে এটি ফেরত দেবে তা পরিষ্কার নয়। আমরা সবাই চাই উপনিবেশবাদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হোক, কিন্তু বাস্তবে তা নয়।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোহিনূর ফেরানোর প্রচেষ্টা খুব একটা জোরালো নয়। তবে ডালরিম্পল মনে করেন, ‘ভবিষ্যতে কোনো এক সময় ভারত ও ব্রিটিশদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া অসম্ভব নয়।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘ব্রিটিশদের ভারতকে আরও বেশি প্রয়োজন হবে এবং ভারতের আনুকূল্য তাদের লাগবেই। কোহিনূর আগামী দশকগুলোতে সহজেই একটি বড় কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS