চাকরিজীবীদের দুই দিনের ঐচ্ছিক ছুটির কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দাপ্তরিক সেবা কার্যক্রমে ১২ দিনের দীর্ঘ স্থবিরতা নেমে এসেছে। ঠিক সেই সময় এই স্থবিরতা দেখা দিল, যখন বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে ব্যাংকে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা অনেক জরুরি ছিল বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বিশ্বে এখন প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম প্রতি মুহুর্তে বাড়ছে।এই সময়ে সময়মতো একটি এলসি খুলতে পারলে হাজার হাজার ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।
জানা গেছে, এবারের ঈদের ছুটির সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ১২-১৫ শতাংশ কর্মী বা কোনো কোনো ব্যাংকে এর থেকেও বেশি কর্মী দুই দিন ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছেন। ফলে তারা এই ঈদে ১২ দিন ছুটি কাটাচ্ছেন।
১৭ মার্চ শুরু হওয়া ঈদুল ফিতরের টানা ৭ দিন ছুটি শেষ হয় গত সোমবার (২৩ মার্চ)।এরপর মঙ্গলবার ও বুধবার (২৪ ও ২৫ মার্চ) দুইদিন সরকারি অফিস-আদালত খোলা ছিল, ব্যাংক-বীমা খোলা ছিল। তবে কর্মী ও গ্রাহক উভয়ের উপস্থিতিই কম ছিল। কারণ কর্মীদের অনেকেই এই দুইদিন ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছিলেন।
বৃহষ্পতিবার (২৬ মার্চ) স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে আবারও সরকারি ছুটি পড়ল।
এই ছুটির সঙ্গে শুক্রবার ও শনিবারের (২৭ ও ২৮ মার্চ) সাপ্তাহিক ছুটি থাকছে। ফলে মাঝখানের দুই দিন অর্থাৎ ২৪ ও ২৫ মার্চ যেসকল চাকরিজীবী ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছেন তারা ১৭ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত টানা ১২ দিনের ছুটি কাটাচ্ছেন।
বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, যারা শুক্র-শনিবার ছুটি পান তাদের অনেকেই মঙ্গল-বুধবার (২৪ ও ২৫ মার্চ) ঐচ্ছিক ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঈদ উদযাপন করছেন বলে জানা গেছে।
এ কারণে ঢাকা শহর বুধবার পর্যন্তও অনেকটা ফাঁকা দেখা যায়। ব্যাংকেও ছিল গ্রাহক স্বল্পতা। ঢাকার গণপরিবহন চলাচলও ছিল সীমিত।
ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যেও ঐচ্ছিক ছুটি নিয়ে টানা ১২ দিনের ছুটি কাটানোর প্রবণতাকে ‘অনৈতিক আচরণ’ বলে মন্তব্য করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, ব্যাংকের সঙ্গে অন্যান্য দাপ্তরিক সেবায়ও ধীর গতি দেখা গেছে। এতে অনেক গ্রাহককে আগামী ২৮ মার্চের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কারণ একটি সেবা আরেকটি সেবার সঙ্গে জড়িত। তারা বলছেন, ভূমি জরিপ অফিসের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। গত দুই দিন ব্যাংকে তাৎক্ষনিক লেনদেন হলেও নতুন হিসাব খোলা বা ঋণ সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ অনেক সেবাই বন্ধ ছিল।
ব্যাংক কর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের অনেকেই ছুটি কাটাচ্ছেন। সীমিত পরিসরে ব্যাংকে নগদ লেনদেন হচ্ছে। তবে নতুন হিসাব খোলা বা ঋণ ছাড় করার মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাযক্রমই স্থবির হয়ে পড়েছে।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি এই দুইদিন অফিস করলাম। ব্যাংকের কার্যক্রম একরকম স্বাভাবিকই ছিল। তবে গ্রাহক কম থাকায় কাজও কম ছিল। আমাদের মোট কর্মীর প্রায় ১২ শতাংশই এই দুইদিন ছুটি নিয়েছে। ঢাকার কর্মীদের মধ্যে আলাদা করে হিসেব করলে এই হার আরও অনেক বেশি হবে।’
এই ব্যাংক এমডি মনে করেন ২৮ মার্চের পরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হবে। এর আগে ছুটির ফাঁদে পড়া স্থবিরতা কাটবে না।
ঢাকার তেজগাঁওয়ের মো. হাবিবুর রহমান জানান, তিনি একটি জমি সংক্রান্ত মামলার তারিখের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে জড়িত অনেক সরকারি কর্মী অফিসে না আসায় বুধবার তিনি এ সংক্রান্ত কোনো কাজই করতে পারেননি।
ফলে তাকে আগামী রোববার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, লম্বা ছুটি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। গত বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৯ দিনের ছুটি ছিল।
ওই বছর ঈদুল আজহায় ছুটি বেড়ে ১০ দিনে গিয়ে ঠেকে। ৫ জুন থেকে শুরু হওয়া সরকারি ছুটি শেষ হয় ১৪ জুন। এ ছুটির প্রভাবে বাজারে চাল, ডিম, মুরগি, সবজিসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছিল। টানা ছুটির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায়ও উঠে আসে।
এদিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাজারের তথ্য বলছে, গত দুই সপ্তাহে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যেরই দাম বেড়েছে। সব ধরনের সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখি। দীর্ঘ ছুটিতে বড় শহরের মানুষ ঈদ উদযাপন করতে গ্রামে যাচ্ছেন। এতে শহরের তুলনায় বেশি দূরত্বে থাকা গ্রামে পণ্য পরিবহন বেড়েছে। সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব। এরই মধ্যে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করতে শুরু করেছে। দেশের অনেক ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় লাইনে থেকে চাহিদামতো জ্বালানি তেল পাননি গ্রাহকরা। ঢাকার অনেক ফিলিং স্টেশন ছিল বন্ধ।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে প্রায় প্রতিদিনই ব্যাংক খোলা রাখা দরকার ছিল। কারণ বিশ্বে প্রতি মূহুর্তে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। এই সময়ে ব্যাংক বন্ধ থাকায় রেমিট্যান্স আদান-প্রদান বন্ধ রয়েছে, ডলার ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ রয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এতে আমাদের অর্থনীতি পিছিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখন এমন একটি সময় যখন অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার জন্য নতুন নতুন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু আমরা ঠিক সেই সময় ঐচ্ছিক ছুটি নিয়ে ঈদের ছুটিকে টেনে লম্বা করে ১২ দিনে নিয়ে যাচ্ছি। এতে আমাদের অর্থনীতিকে চরম মূল্য দিতে হবে। আমাদের সার আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমাদের জ্বালানী আমাদানি বন্ধ রয়েছে। এর সঙ্গে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় জড়িত। এই পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি করছে।
এই সময়ে চাকরিজীবীদের ঐচ্ছিক ছুটি নেওয়াকে অনৈতিক আচরণ হিসেবে দেখছেন এই গবেষক।
টানা এই ছুটি দেশের চলমান শঙ্কাময় পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে বলে মনে করেন অর্থনীতির গবেষক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘সারা বছরই এই দিবস-সেই দিবস বলে অফিস-আদালত বন্ধ রাখা হয়। তার মধ্যে উৎসবকে কেন্দ্র করে এত বড় ছুটি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই বিপদে ফেলে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত সরকারি ছুটি থাকে না। চীনারা সারা বছর কাজ করে নববর্ষে দীর্ঘ ছুটিতে যায়। কিন্তু আমাদের সারা বছর এত ছুটি থাকার পরও উৎসব উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি দেওয়া হয়। এর সঙ্গে ঐচ্ছিক ছুটি নেওয়ায় দাপ্তরিক কার্যক্রমে আরও ধীর গতি নেমে আসে।
গত ১৭ থেকে ২৩ মার্চ আমদানি-রপ্তানিসহ বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এর ফলে পণ্যবাহী ট্রাকজটের পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়ে বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দরের কার্যক্রম।
এসময় দেশের ব্যাংক, বিমা, পুঁজিবাজারসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। মঙ্গলবার ছুটির পর আবারও লেনদেন শুরু হয়। তবে পরের দিন বৃহষ্পতিবার থেকে টানা ছুটি থাকায় বুধবারেও লেনদেন ছিল সীমিত। আগামী রোববারের আগে এই স্থবিরতা কাটছে না।