আ.লীগ সরকারের ভুল নীতিতে বিদ্যুৎখাতে ৭ বছরে ভর্তুকি বেড়েছে ৭ গুণ

আ.লীগ সরকারের ভুল নীতিতে বিদ্যুৎখাতে ৭ বছরে ভর্তুকি বেড়েছে ৭ গুণ

আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতির কারণে প্রতিবছরই বিদ্যুৎখাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি গুণতে হচ্ছে। যে ভার বহন করতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে, এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকেও সেই ঘানি টানতে হচ্ছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৭ বছরের ব্যবধানে এইখাতে ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াচ্ছে সাত গুণেরও বেশি বা ৬৩৩ শতাংশ। 

জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎখাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছিল ৮ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা।আর আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎখাতে সরকারকে লোকসান গুণতে হবে ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ বিভাগের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে আগামী অর্থবছরে লোকসান বা ভর্তুকির এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

তাতে বলা হয়েছে, অদক্ষ ব্যবস্থপনা, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ, বিদ্যুৎক্রয় চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করার কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত এই সংকটাপন্ন অবস্থার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট এই অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের দেড় বছরের স্বাস্থ্য বাজেট এবং আড়াই বছরের কৃষি বাজেট দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানা যায়, চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। একই সাথে চলতি অর্থবছরে কৃষিখাতে বরাদ্দ রয়েছে ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।

মূলত জনগণের কাছ থেকে কর হিসেবে আদায় করা অর্থ থেকেই বিদ্যুৎখাতের এই বিপুল লোকসান মেটানো হচ্ছে, ফলে আর্থিক চাপের ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপরই। বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকির এই প্রবণতা থামার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

প্রতিবছর ভর্তুকি বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশী-বিদেশী কোম্পানি থেকে অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে প্রতি বছর বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি বেড়েছে। যেমন ২০২১-২২ অর্থবছরে এখাতে ভর্তুকি লেগেছে ১১ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। এরপরের ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা একলাফে ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দ্বিগুণের মতো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা হবে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্য হচ্ছে, জয়েন্ট ভেঞ্চারে স্থাপিত ৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সরকারি/বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি এবং আদানি পাওয়ার ঝাড়খান্ডসহ ভারত ও নেপাল হতে বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ১৮ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎখাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ওই বরাদ্দ থেকে ইতোমধ্যে ৩২ হাজার ১১০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে এবং ৩ হাজার ২৯০ কোটি টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অর্থ বিভাগের বরাদ্দের অতিরিক্ত ১৮ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এছাড়াও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কর্তৃক সম্প্রতি নির্ধারিত তরল জ্বালানির বর্ধিত মূল্য অনুযায়ী বর্ধিত ঘাটতি ১১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর ভর করে উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণের বেশি বাড়ানোর পর লোকসান দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো পিডিবির লোকসান ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। গত ১৭ বছর ধরে পিডিবি টানা লোকসানের মধ্যেই রয়েছে।

গত ২৫ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।

কমিটির তাদের প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ২০১৫ সালে পিডিবির লোকসান ছিল যেখানে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা দশগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হয় ১২ টাকা ৩৫ পয়সা, কিন্তু তারা বিক্রি করছে মাত্র ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়।

পিডিবিকে কেবল টিকিয়ে রাখতেই বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎখাতের লোকসানের পেছনে মূলত অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলো দায়ী। 

বিদ্যুৎখাতে বড় লোকসানের প্রধান কারণগুলো হলো, ক্যাপাসিটি চার্জ বা বসিয়ে রাখা বিদ্যুৎকেন্দ্র। বেসরকারি কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বা অলস বসে থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ বা ভাড়ার টাকা দিতে হয়, যা লোকসানের প্রধান কারণ। এখাতে এক লাখ কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ ভর্তুকির ৮১ শতাংশ ক্যাপাসিটি চার্জ।

প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির কারনে আমদানিকৃত এলএনজি ও ডিজেলের মাধ্যমে বেশি ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। জ্বালানি আমদানিতে বেশি ডলার ব্যয় হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। বিতরণ পর্যায়ে অবৈধ সংযোগ এবং সিস্টেম লসের কারণেও প্রচুর বিদ্যুৎ ও টাকা নষ্ট হয়। নিজস্ব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলন না করে আমদানি নির্ভর হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎখাতে শ্বেতহস্তী সৃষ্টি বা দায়মুক্তি আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়া চুক্তি করার কারণেও এই খাতে লোকসান বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্যমতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এবং ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রয়োজন হচ্ছে। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎখাতে অস্বচ্ছ চুক্তি, দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন এবং অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির ফলে এ খাতে লোকসান ক্রমেই বাড়ছে। তারা মনে করছেন, দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই ভর্তুকির চাপ জাতীয় অর্থনীতির ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS