News Headline :
তেহরানের খোমেনি বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় চালু হচ্ছে! ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়েছেন নেতানিয়াহু ইসলামাবাদে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সপ্তাহের ব্যবধানে আরও চড়া বাজার প্রিমিয়াম এসইউভি মিতসুবিশি ডেস্টিনেটর উন্মোচন করল র‍্যাংগস লিমিটেড এনসিপিতে যোগ দিলেন ইসহাক-রনি-কাফি-ফ্লোরা ডাকসু নেতা-সাংবাদিকদের মারধরের প্রতিবাদে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ মিছিল মে দিবসে শ্রমিক দলের সমাবেশ, প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ ফোরামে ন্যায্য বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো-টেকসই এলডিসি উত্তরণের আহ্বান বাংলাদেশের রমনায় চোরাই সিএনজিসহ প্রতারক চক্রের সদস্য গ্রেপ্তার
যুক্তরাষ্ট্রের এক গুপ্তধনের দ্বীপে যা দেখলাম

যুক্তরাষ্ট্রের এক গুপ্তধনের দ্বীপে যা দেখলাম

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান পেদ্রো উপকূল হয়ে আমাদের জাহাজ চলছে প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ–পশ্চিম কোণ বরাবর। বন্দর ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ ছুটল পূর্ণ গতিতে। পেছনে তীরের শেষ চিহ্নটুকুও মিলিয়ে গেল একসময়।

জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে যখন দূর সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছি, হঠাৎ ভেতরের শোরগোলে মনোযোগ নষ্ট হলো। রেলিংয়ের দিকে এক এক করে সরে গেল সবাই। কৌতূহলী হয়ে সেদিকে গেলাম। কিন্তু ভিড় ঠেলে আর সামনে যেতে পারি না। এক প্রবীণ দম্পতি নিজেদের জায়গাটুকু ছেড়ে বললেন, ‘এসো ছেলে, এখানে দাঁড়িয়ে দেখো।’

কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিচে তাকাতেই বিস্ময়কর দৃশ্য। একঝাঁক ডলফিন জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটছে। এই বুঝি জাহাজের খোলে ধাক্কা খাবে ওরা!  

কতক্ষণ ঝুঁকে ছিলাম মনে নেই। দেখার সাধ মিটলে প্রবীণ দম্পতিকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হই। হাত দিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গি করে বললেন, তুমি দেখতে থাকো। আলাপ জমাতে নিজে থেকেই পরিচয় পর্ব সেরে নিলেন। তাঁর নাম মার্সেল আর তাঁর স্ত্রীর নাম ক্লোয়ি।  

আমার বন্ধু নাঈমকে মার্সেল–ক্লোয়ির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার। তাই নাঈমের খোঁজে বের হলাম। নাঈম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। পিরোজপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ত। এখন পুরোদস্তুর মার্কিন। পৃথিবীর কোনো কিছুতে তার আগ্রহ নেই। মুখে পুরু সানস্ক্রিন মেখে জাহাজের ডেকে সে আধশোয়া। ওকে ডেকে নিয়ে মার্সেল আর ক্লোয়ির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম।

আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি জানালে মার্সেল বিস্ময় চেপে না রেখে বললেন, ‘পৃথিবীর ঠিক অপর প্রান্ত থেকে চলে এসেছ যে!’

একসময় জাহাজের গতি কমে এল। দূরে দেখা গেল পাহাড়ের মতো এক অবয়ব। ধীরে ধীরে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে যেন ভেসে উঠল ঠাসবুনোট বনের এক দ্বীপ। আরও কাছে গেলে দেখলাম, সারি সারি সেইল বোট আর সাদা ইয়ট নোঙর করে রাখা। জাহাজ থেকেই পাহাড়ি উপত্যকাজুড়ে ঘরবাড়িগুলো স্পষ্ট হতে থাকল।

মার্সেল বললেন, ‘দ্বীপের এই শহরের নাম অ্যাভালন। পুরোটা ঘুরে দেখো, ভালো লাগবে। আর জানো তো, প্রাচীনকালে জলদস্যুরা এ দ্বীপে গুপ্তধন লুকাতে আসত। লোকে এখনো গুপ্তধনের খোঁজে এখানে আসে।’

এই প্রথম নাঈমের চোখে–মুখে আগ্রহ দেখা গেল। যাকে হাতি দিয়েও টেনে তোলা যায় না, সে–ই ব্যাকপ্যাক নিয়ে জাহাজ থেকে নামার জন্য তাড়া দিতে থাকল।

তীর ধরে শহরের প্রান্তে এসে হাজির হয়েছি। নোনা হাওয়া আর উড়ে আসা আশপাশের সি ফুডের কড়া ঘ্রাণে ক্ষুধা তীব্র হতে থাকল। ছোটখাটো সাজানো–গোছানো একটা রেস্তোরাঁয় চটজলদি ঢুকে পড়লাম। ফিশ টাকোস দিয়ে খাওয়া শুরু হলো। নরম টরটিলার ভেতরে লেবুর রস মেশানো গ্রিল করা তাজা মাছ তার ওপর মেক্সিকান সসের পরত মাখানো খাবারগুলো শেষ হয়ে গেল মুহূর্তে।

তারপর এল ভুট্টার আটা দিয়ে বানানো কড়কড়ে নাচোস আর অ্যাভোকাডো দিয়ে বানানো নরম ডিপ। তারপরও খাই খাই ভাবটা বাড়ল বৈ কমল না।

শেষে গ্রিলড ফিশ দেওয়া সিজার সালাদ খেয়ে মনে হলো, এবার শেষ করা যাক। নাইমের প্লেটের ভাজা মাছ আর গরম ফ্রাই তখনো শেষ হয়নি। তাই বসে না থেকে রেস্তোরাঁ ম্যানেজারের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলাম। পাহাড়ি ট্রেইল ধরে হেঁটে কিংবা গলফ কার্টে করে দ্বীপ ভ্রমণে যাওয়া যায়। তবে তিনি আমাদের ট্রেইল ধরার পরামর্শ দিলেন।

নাঈমকে তাড়া দিতেই একটা লেমোনেড হাতে নিয়ে হেলতে–দুলতে বের হলো। দুজনের চোখেই তখন ভাতঘুম নেমেছে। বুনো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলে তাজা বাতাস আর জলদস্যু দ্বীপে অ্যাডভেঞ্চারের উত্তেজনায় ঘুম একসময় কোথায় যেন উড়ে গেল।

ততক্ষণে সূর্যটা পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। পাহাড়ের গায়ে ছায়া লম্বা হয়ে নামতে শুরু করেছে। শহরটি পেছনে ফেলে আমরা পাহাড়ি ট্রেইল ধরে ওপরে উঠতে শুরু করি। পাথুরে পথের দুই পাশে ঘন ঝোপঝাড়। অপরিচিত সব ক্যাকটাসে ফুল ফুটেছে। হাঁটতে হাঁটতে খোলা জায়গায় এলে নিচে নীল সমুদ্রটা দেখা যায়। দূরে সেইল বোটগুলো সাদা খেলনার মতো ভাসছে তখনো। শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে নিচে হারিয়ে গেল একসময়।

আরও ওপরে উঠতেই পাহাড়ের ঢালে কয়েকটা হরিণ চড়তে দেখলাম। মানুষের কাছাকাছি এসেও ওরা ভয় পেল না। এখানে থেকে খোলা সমুদ্র বহুদূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। জলদস্যুরা এ দ্বীপ কেন এত পছন্দ করত, বোঝা গেল এবার।

অনেক উঁচু থেকে সমুদ্রের সব পথ দেখা যাওয়ায় শত্রু জাহাজ এলে আগেভাগেই টের পেয়ে যেত তারা। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার এই উপকূলে ১৬ থেকে ১৮ শতকে প্রচুর স্প্যানিশ গ্যালিয়ন জাহাজ চলাচল করত। ধনসম্পদে ভর্তি এসব জাহাজে হামলার জন্য জলদস্যুদের জন্য এ দ্বীপটি ছিল ভারি পছন্দের।

পাহড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে এক জোড়া পেরেগ্রিন ফ্যালকনকে ডানা মেলে চক্কর দিতে দেখলাম। নাঈম দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে আছে। অভিজ্ঞতার আলোকে বলল, ‘এসব পাখি পাহাড়ের কিনারায় বাসা বানায়। চল, খুঁজে দেখি।’

বলেই সে ট্রেইল ছেড়ে জঙ্গলের পথ ধরল। তাকে বলেকয়েও থামানো গেল না। পা পিছলে নিচে পড়লে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না জেনেও তার পিছু নিতে হলো। পাখির বাসা খুঁজে না পেলেও আমরা পাহাড়ের খাড়িতে অনেক গুহামুখ খুঁজে পেলাম। কোনটা যে প্রাকৃতিক আর কোনটা যে লুকিয়ে থাকার জন্য বানানো হয়েছিল, সেটা এখন আর বোঝা যায় না।

এদিকে সন্ধ্যা নামছে। কেমন যেন ঠান্ডা আর আর গা শিরশিরে অনুভূতি। জলদস্যু কিংবা ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া কোনো নাবিক হয়তো এখানে থেকেছে। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে তাদের নাম আর নিশানা। শুধু টিকে আছে দ্বীপটি, সহস্র রহস্য আর না জানা কোন গুপ্তধন বুকে নিয়ে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS