প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা কবিতা ‘কাজের ছেলে’। কবিতাটির প্রথম চরণ– ‘দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল…’।পঞ্চাশ থেকে ষাটোর্ধ্বরা ছোটবেলায় এ কবিতা পড়েছেন। মসুরের ডাল বর্তমান বাজারে সহজলভ্য হলেও কবিতার সেই দাদখানি চাল হারিয়ে গেছে।
অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বা যশোর-বরিশাল অঞ্চলে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ধানের সঙ্গে দাদখানি ধানও উৎপাদন হতো। কবির পৈতৃক নিবাস যশোর এলাকায়।দাদখানি চাল বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ছিল বলেই কবি তার শিশুতোষ কবিতায় সে নাম তুলে আনেন।
দুই বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে চাষ হচ্ছে নতুন এক জাতের ধান।ওই ধানের চাল মনে করিয়ে দিচ্ছে দাদখানি চালের কথা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত ব্রি ধান-১০৮ দেশে হাতেগোনা কয়েকজন কৃষক গত বছর চাষ করেন। তাদেরই একজন খুলনার ডুমুরিয়ার সৌখিন ধান আবাদকারী এস এম আতিয়ার রহমান। তিনি উপজেলার কার্তিকডাঙ্গা বিলে মাত্র এক বিঘা জমিতে এ ধান চাষ করেছেন।
জানতে চাইলে আতিয়ার রহমান বাংলানিউজকে বলেন, ২০১০ সালে ব্রি ধান-৫০ (বাংলামতি) চাষ করার পর থেকে গত ১৬ বছর তিনি ব্রি উদ্ভাবিত প্রায় প্রত্যেকটি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ধান আবাদ করে আসছেন। এর মধ্যে কয়েকটি জাতের ধানের চাল খেতে খুবই ভালো। যদিও এখনো কৃষকের কাছে ব্রি ধান-২৮ মেগাজাত হিসেবে টিকে আছে। কিন্তু এরই মধ্যে ব্রি ধান-২৮ এর জায়গায় অবস্থান করে নিচ্ছে ব্রি ধান-৫০, ৫৮, ৬৩, ৯০, ১০০, ১০২, ১০৪ ও বিনাধান-২৫। তবে গত বছর ব্রি ধান-১০৮ চাষের পর এর চাল খেয়ে কবিতার সেই দাদখানি চালের কথা স্মরণে আসে। যদিও ব্রি এখন পর্যন্ত এ ধানের কোনো বাংলা বা বাণিজ্যিক নাম দেয়নি। তবে এই সৌখিন চাষি এটির নাম দিয়েছেন নতুন দাদখানি, যা থেকে উৎপাদিত চালের নাম হবে ‘দাদখানি চাল’।

আতিয়ার রহমান বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে এটি এ নামের উপযুক্ত। পোলাও চালের মতো সরু ও চিকন এ চালে শুধু সুগন্ধ নেই। তাছাড়া সব গুণই রয়েছে। নন-অ্যারোমেটিক এত ছোট চিকন চাল বাজারে খুব কমই আছে। এ চাল কাটারিভোগ, জিরাশাইল ও ব্রি উদ্ভাবিত ব্রি ধান-৯০ এর সমপর্যায়ের বা তার চেয়েও কিছুটা খাটো।
তিনি আরও বলেন, এ ধানের আতপ চালের ভাত রান্নার পর ১২-১৫ ঘণ্টা ভালো থাকে। সকালে রান্না করে রাতে খাওয়া যায়। সেদ্ধ চালের ভাতও ৮-১০ ঘণ্টা ভালো থাকে। প্রত্যেকদিন পোলাও চালের ভাত খাওয়া যায় না। সে জায়গায় নতুন দাদখানি চাল তিন বেলা সমান খাওয়ায় কোনো বিরুচি বোধ হয় না।
এই চাল দেশের চিকন চালের ভোক্তাদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হবে এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভোক্তাদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদর পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন সৌখিন চাষি আতিয়ার। তিনি বলেন, এ চাল বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহে আরও ৮-১০ বছর লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, মাঠ পর্যায়ে এ ধানের চাষ এখনো একেবারে সীমিত।
আতিয়ার রহমান জানান, মাঠ পর্যায়ে ভালোফলন ও চালের গুণগতমানের কারণে এ বছর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সারা দেশে বীজ উৎপাদনে শতাধিক প্রদর্শনী প্লট দিয়েছে। ডুমুরিয়ার কার্তিকডাঙ্গা বিলে এক একর জমিতে বীজ সম্প্রসারণে প্রদর্শনী প্লট দিয়েছে ব্রি। ইতোমধ্যে ধানের ফ্লাওয়ারিং শেষ হয়েছে, ছড়ার ধানে পাক ধরেছে। ২০ এপ্রিলের মধ্যে ধান কাটা সম্ভব হবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে আশানুরূপ ফলন হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। এখনই আশপাশের চাষিরা আসছেন নতুন দাদখানি নামের ব্রি ধান- ১০৮ এর ফলন দেখতে।

কার্তিকডাঙ্গা বিলের কৃষক হুজাইফা বলেন, কার্তিকডাঙ্গা বিলে ব্রি ধান-১০৮ এর অনেক ভালো ফলন হয়েছে। এটা দেখে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। আগামীতে আমরাও এ জাতের ধান চাষ করব।
ব্রি’র প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার বিশ্বজিৎ কর্মকার বলেন, আমরা আশা করছি ব্রি ধান-১০৮ চাষি ও ভোক্তাদের কাছে জায়গা করে নেবে। ফলন ও বাজারে ভালো দাম পেলে চাষি লাভবান হবেন। চলতি বোরো মৌসুমে এ ধানের কয়েকশ প্রদর্শনী প্লট ছাড়াও বীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে চাষ হয়েছে। আগামী ১০-২০ দিনের মধ্যে ফসল কর্তনের উপযোগী হবে।
এ ধানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি জানান, ধানের ঘন গাঁথুনি থাকায় প্রতি ছড়ায় ২৫০-২৭০টি পর্যন্ত ধান পাওয়া যায়। তাছাড়া বাতাসে হেলে পড়ে না, রোগবালাইও কম। ধানের পাতা চওড়া ও লম্বা হওয়ায় খড়ের পরিমাণও অন্য অনেক ধানের চেয়ে বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ব্রি ধান-১০৮ জাতটা অনেক ভালো। এটা পাকিস্তান ও ভারতীয় বাসমতির মতো না হলেও সরু ও লম্বা। এর ফলন অনেক ভালো হয়েছে। তবে জাতটি যাচাই-বাছাই করে চাষের জন্য দিলে আরও ভালো হতো।