News Headline :
তেহরানের খোমেনি বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় চালু হচ্ছে! ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়েছেন নেতানিয়াহু ইসলামাবাদে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সপ্তাহের ব্যবধানে আরও চড়া বাজার প্রিমিয়াম এসইউভি মিতসুবিশি ডেস্টিনেটর উন্মোচন করল র‍্যাংগস লিমিটেড এনসিপিতে যোগ দিলেন ইসহাক-রনি-কাফি-ফ্লোরা ডাকসু নেতা-সাংবাদিকদের মারধরের প্রতিবাদে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ মিছিল মে দিবসে শ্রমিক দলের সমাবেশ, প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ ফোরামে ন্যায্য বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো-টেকসই এলডিসি উত্তরণের আহ্বান বাংলাদেশের রমনায় চোরাই সিএনজিসহ প্রতারক চক্রের সদস্য গ্রেপ্তার
শখের পোষা প্রাণীতে বড় বিপদ, টিকায় উদাসীনতায় বাড়ছে জলাতঙ্ক ঝুঁকি

শখের পোষা প্রাণীতে বড় বিপদ, টিকায় উদাসীনতায় বাড়ছে জলাতঙ্ক ঝুঁকি

দেশে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে দীর্ঘদিনের সমন্বিত কর্মসূচি এখন কার্যত স্থবির, যার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে জনস্বাস্থ্যে। ২০১০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়া হলেও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থসংকট ও সমন্বয়হীনতায় তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।থমকে গেছে কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও। ফলে টিকাবিহীন কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে জলাতঙ্ক সংক্রমণের ঝুঁকিও। 

এমন প্রেক্ষাপটে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে কামড় বা আঁচড় নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা, যাদের চোখেমুখে উদ্বেগ-আতঙ্ক। তবে চলতি বছর কুকুর নয়, বিড়ালের আঁচড় ও কামড়েই বেশি জখম হচ্ছেন মানুষ।হাসপাতালের তথ্য বলছে, অ্যান্টি-রেবিস (জলাতঙ্ক প্রতিরোধী) ভ্যাকসিন নিতে আসা রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশই বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে আহত। অথচ এক সময় এই হার ছিল মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
২০২৫ সালে শুধু মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই কুকুর-বিড়ালের কামড়ে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ কুকুরের কামড় নিয়ে, আর ৬০ শতাংশই বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ে জখম।

বছরভিত্তিক হিসাবেও দেখা যায় রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৩ সালে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জনে। ২০২৫ সালে সংখ্যা পৌঁছায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩-এ। আর ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন।

মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে কুকুর-বিড়ালের কামড় বা আঁচড় থেকে ছড়ানো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জলাতঙ্ক রোগে মারা যান ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জন। চলতি বছরের প্রথম আড়াই মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।

এখন প্রতিদিন নতুন করে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী হাসপাতালে আসছেন। পুরনো রোগী মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিনগুণ।

‘বিড়াল পুষি, কিন্তু টিকা দিই না’
হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষমাণ রোগীদের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে সচেতনতার ঘাটতির একই চিত্র। শখ করে পোষা প্রাণী রাখলেও তাদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে উদাসীনতা স্পষ্ট।

চার বছর ধরে বিড়াল পালন করছেন অঞ্জেলা সরকার। কিন্তু কখনো টিকা দেননি। একজন বিড়াল মালিক বলেন, ‘ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি। আমার ভালো লাগে, তাই পালি। বাইরে যায় না, তাই ভাবিনি দরকার।’

অন্য এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘জানালা দিয়ে বিছানায় উঠে আসে। একদিন খেয়াল না করেই আঁচড় মেরে দেয়। তখন বুঝলাম, টিকা না দেওয়াটা কত বড় ভুল।’

ছোট আঁচড়, বড় ঝুঁকি
মিরপুরের বাসিন্দা তানভীর (ছদ্মনাম) তিন মাস আগে একটি বিড়াল ঘরে আনেন। একদিন খেলতে গিয়ে বিড়ালটি হঠাৎ আঁচড় দেয়। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে আতঙ্কে হাসপাতালে যান।

‘ডাক্তার বললেন, এটা হালকা মনে হলেও ঝুঁকি বড়। সঙ্গে সঙ্গে টিকা নিতে হবে,’ বলেন তিনি।

কুড়িগ্রামের এক কিশোরীর ঘটনাও একই বার্তা দেয়। বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার পর নিজের পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আবার ঝুঁকিতে পড়ে সে। পরিবারের অবহেলার কারণে দেরিতে চিকিৎসা নিতে হয়।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা সাড়ে তিন বছর বয়সী আব্দুর রহমানের (ছদ্মনাম)। বিড়ালের আঁচড়ের পর টিকা নেওয়া হলেও ১২ দিন ধরে সে অবচেতন।

তার মা বলেন, “বাচ্চার ওজন ১২ কেজি ছিল, এখন মনে হয় ৮ কেজিও নেই। ডাকছি, কিছুই শুনছে না।”

চিকিৎসকদের মতে, একবার রেবিস বা জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব।

কুকুরের আক্রমণও বাড়ছে
শুধু বিড়াল নয়, কুকুরের আক্রমণও বাড়ছে। রাজধানীর উত্তরখানে তিন বছর বয়সী আনাসকে কামড় দেয় একটি বেওয়ারিশ কুকুর। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে টিকা দেওয়া হয়। আনাসের বাবা বলেন, ‘কুকুরটা কার, জানি না। হঠাৎ এসে কামড় দেয়। ভয় পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ভ্যাকসিন সংকটে পরিস্থিতি আরও জটিল
সারাদেশে ৪১৬টি কেন্দ্রে অ্যান্টি-রেবিস টিকা দেওয়া হয়। বছরে প্রায় ৮ লাখ টিকা সংগ্রহ করা হলেও বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে কোনো টিকা নেই।

এক কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রগুলোকে নিজস্ব বাজেট থেকে টিকা কিনতে বলা হয়েছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নতুন সরবরাহ আসতে পারে।

অন্যদিকে কুকুরের টিকাদান কর্মসূচিও বন্ধ। ফলে টিকা না পাওয়া কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

সমন্বয়হীনতায় অচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং সিটি করপোরেশন— কোনো সংস্থাই বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ও ধারাবাহিক কর্মসূচি পরিচালনা করছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভেটেরিনারি কর্মকর্তা শরণ কুমার সাহা বলেন, টিকা সরবরাহের সংকট ও পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাবে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ লুৎফর রহমান জানান, রাজধানীতে মোট বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই, যা কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। তবে এই পরিকল্পনায় আপাতত মানুষের জন্য টিকাদান কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে; কুকুরের টিকাদান বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এতে অন্তর্ভুক্ত নেই।

এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, জলাতঙ্ক এমন একটি প্রাণঘাতী রোগ, যার লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে। ফলে এ রোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই একমাত্র কার্যকর উপায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, কোনো এলাকায় ধারাবাহিকভাবে অন্তত তিন বছর ৭০ শতাংশ কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার আওতায় আনা গেলে সেই অঞ্চলকে কার্যত জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব।

চিকিৎসকদের মতে, কামড় বা আঁচড়ের পর যথাসময়ে চিকিৎসা না নিলে ভাইরাসটি দ্রুত ক্ষতস্থান থেকে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। একপর্যায়ে রোগীর আচরণে অস্বাভাবিকতা, খিঁচুনি এবং পানিভীতি (হাইড্রোফোবিয়া) দেখা দেয়, যা জলাতঙ্কের প্রধান লক্ষণ। এই পর্যায়ে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

যা করণীয়
চিকিৎসকদের পরামর্শ—কামড় বা আঁচড়ের সঙ্গে সঙ্গে সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুতে হবে;
দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে; চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্যাকসিন নিতে হবে এবং পোষা প্রাণীকে নিয়মিত টিকা দিতে হবে।

বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্যের নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করলেও রেবিসের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ এখনো প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই নীরব বিপদ আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS