ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব আপসের পথ না বেছে সংঘাতের পথই বেছে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নিয়োগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সরাসরি এক ধরনের জবাব। ট্রাম্প এর আগে খামেনির ছেলেকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
সংঘাতের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।বর্তমানে যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে।
ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় তেহরানে কট্টরপন্থিদের ক্ষমতা আরও দৃঢ় হলো। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে এবং এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে পারে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “মোজতবাকে ক্ষমতায় আনা মানে একই কৌশল চালিয়ে যাওয়া।এত বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে, এত ঝুঁকি নিয়ে শেষ পর্যন্ত ৮৬ বছর বয়সী একজনকে হত্যা করা আর তার জায়গায় তারই কট্টরপন্থি ছেলেকে বসতে দেওয়া, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় অপমান।”
ইরানের জটিল ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতাই রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। পররাষ্ট্রনীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি, এমনকি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের ওপরও তার প্রভাব থাকে।
আরও সংঘাতের পথে ইরান
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবাকে বেছে নেওয়া একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: ইরানের নেতৃত্ব আপসের কোনো পথ বেছে নিচ্ছে না।
বরং তারা সংঘাত, প্রতিশোধ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের পথেই এগোতে প্রস্তুত।
সূত্রগুলোর মতে, মোজতবাকে দেশের ভেতরে অসন্তুষ্ট জনগণ এবং বাইরে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ—উভয় দিক থেকেই তীব্র চাপের মুখে পড়তে হবে। তবে তিনি দ্রুত ক্ষমতা সংহত করার পদক্ষেপ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর ফলে সম্ভবত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ক্ষমতা আরও বাড়বে, দেশের ভেতরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে এবং ভিন্নমত দমনে কঠোর দমননীতি চালু হতে পারে।
তেহরানের ঘনিষ্ঠ এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “বিশ্ব একসময় তার বাবার যুগকে মিস করবে।মোজতবার সামনে লৌহমুষ্টি দেখানো ছাড়া উপায় থাকবে না। যুদ্ধ শেষ হলেও দেশের ভেতরে কঠোর দমননীতি চলবে।”
ইতোমধ্যেই দেশে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরান অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও বাড়তে থাকা দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছিল।
সামনে কঠিন সময়
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত আরেক ইরানি সূত্র জানিয়েছে, মোজতবার নেতৃত্বে সামনে আরও কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, দেশের ভেতরে বাড়তি চাপ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও আক্রমণাত্মক নীতি দেখা যেতে পারে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের আরেক জ্যেষ্ঠ ফেলো পল সেলেম বলেন, “মোজতবা এমন নেতা নন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে পারেন। এখন যে নেতৃত্ব সামনে আসছে, তাদের পক্ষে আপস করা সম্ভব নয়। এটি কট্টরপন্থি সময়ে নেওয়া কট্টরপন্থি সিদ্ধান্ত।”
ইরানের বহু ধর্মীয় নেতা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মহা শয়তান’ বলে অভিহিত করেন। তাদের মতে, খামেনিকে হত্যার ঘটনায় তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অনেক ধর্মীয় নেতা তাকে শিয়া ঐতিহ্যের প্রতিরোধের প্রতীক ইমাম হোসাইনের সঙ্গে তুলনা করছেন।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইর বলেন, “মোজতবা তার বাবার চেয়েও বেশি কট্টরপন্থি। তাকে সমর্থন করছে বিপ্লবী গার্ড। তার সামনে প্রতিশোধ নেওয়ার অনেক হিসাব রয়েছে।”
তবে এতে বড় ঝুঁকিও রয়েছে। ইসরায়েল সতর্ক করে দিয়েছে, খামেনির উত্তরসূরিও তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সামরিক নেতৃত্ব ও ক্ষমতাসীন অভিজাতদের নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ নাও হতে পারে।
মোজতবা দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারপন্থিদের বিরোধী
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে থাকা সংস্কারপন্থিদের বিরোধিতা করে আসছেন। শীর্ষ ধর্মীয় নেতা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তিনি বহু বছর ধরে তার বাবার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন এবং নিরাপত্তা কাঠামো ও বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের ভেতরে শক্তিশালী প্রভাব গড়ে তুলেছেন। অনেকেই তাকে কার্যত ‘মিনি সুপ্রিম লিডার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা আরও জোরদার হয়েছে। ইরানের ভেতরে জ্বালানি ডিপোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চলছে। অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা উপসাগরীয় কয়েকটি দেশেও আঘাত হেনেছে, যার ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে।
মোজতবা শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র কুম শহরের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন এবং তার ধর্মীয় উপাধি হুজ্জাতুল ইসলাম।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ মোজতবার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল, তিনি কোনো নির্বাচিত পদে না থেকেও সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এক সূত্র বলেছেন, “মোজতবার নিয়োগ ট্রাম্প ও ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ইরান পিছু হটবে না, তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।”
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সেলেম ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন সাদ্দাম হোসাইনের শাসনামলের ইরাক বা বাশার আল-আসাদের সিরিয়ার সঙ্গে—যেখানে সরকার দীর্ঘ যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও টিকে ছিল, তবে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
তার ভাষায়, “তারা আরও কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকছে। দেশের ভেতরে এর প্রভাব ভয়াবহ এবং তা গভীর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে।”