মারজানা আক্তারের কোলে ঘুমাচ্ছে ৬ মাস বয়সী রাবা তাসনিম। মাহমুদা আক্তারের কোলেও ৬ মাস বয়সী রুকাইয়া তাসনিম ঘুমাচ্ছে। মাহমুদা বললেন, ওরা কিন্তু যমজ। তাহলে মা কে? মারজানা জানালেন, তিনিই ওদের মা। এই মা ও মেয়েদের সঙ্গে খালামণি সুমাইয়া সুলতানা আর নানি ফরিদা বেগমও এসেছেন। তাঁরা এসেছেন ভোট দিতে। মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে কথা হলো মা, নানি আর খালামণিদের সঙ্গে।
নির্বাচন মানেই তো কিছুটা আতঙ্কের বিষয়, মেয়েদের নিয়ে বের হয়েছেন, ভয় লাগছে না? এসব জানতে চাইলে মারজানা আক্তার হাসি দিয়ে বললেন, ‘নাহ, এবার ভোটে তো কোনো ভয় নেই। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
রাজধানীর বনানী, গুলশান, কাফরুল, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক কেন্দ্রে ভোটারদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। অনেকেই বলেছেন, ঈদের দিনের মতো লাগছে। কেউ কেউ সেজেগুজে ভোট দিতে এসেছেন। পরিবারের ছোট সদস্যদের পাশাপাশি প্রবীণ সদস্যরাও ভোট দিতে এসেছেন। ভোট দেওয়া শেষে পরিবারের সদস্যরা মিলে সেলফি তুলেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাজধানীর গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আজ নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। বাংলাদেশের সবার জন্য মহা আনন্দের দিন। মুক্তির দিন। দুঃস্বপ্নের অবসান, নতুন স্বপ্নের শুরুর দিন।’ তিনি সবাইকে মোবারকবাদ জানান।
প্রধান উপদেষ্টা যখন কথা বলছিলেন, সে সময় পাশ থেকে একজন বলেন, ‘ঈদ মোবারক।’ তখন প্রধান উপদেষ্টাও বলেন, ‘ঈদ মোবারক।’
ঢাকা-১৭ আসনের একই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই আসনের প্রার্থীও তিনি। এ কেন্দ্রটিতেই কথা হলো স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্টস বাংলাদেশ নামের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা শারমীন ফারহানা চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি জাতীয় পতাকা ও স্মৃতিসৌধ আঁকা একটি চাদর গায়ে দিয়ে ভোট দিতে এসেছিলেন।

শারমীন ফারহানা চৌধুরী যেমন বিশেষ একটি চাদর বেছে নিয়েছিলেন ভোট দিতে আসার জন্য, তেমনি মালিহা আনজুম ও মার্জিয়া সুলতানা—এই দুই বোনও একটু সেজেগুজে ভোট দিতে এসেছেন। তাঁরা মিরপুর-১০ নম্বরের কাফরুলের আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। একটি সিএ ফার্মের শিক্ষার্থী মালিহা আনজুম। তাঁর বড় বোন মার্জিয়া সুলতানা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ভোট দেওয়ার পর সেলফি ও হাতের ছবি তুলছিলেন। হাসতে হাসতে বললেন, দুজনে সেজেগুজে এসেছেন ভোট দিতে।
কাফরুলের এই কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর ব্যবসায়ী মো. লুৎফর রহমান, স্ত্রী নাহিদা আক্তার, ছেলে আদিয়ান জায়েদ এবং আহনাফ তাহসিনকে নিয়ে সেলফি তুলছিলেন। প্রতিবেদককেই অনুরোধ করলেন তাঁদের চারজনের একটি ছবি তুলে দিতে। বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চান বলে জানালেন।

মোহাম্মদপুরের বেগম নূরজাহান মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ভোট দিতে এসেছিলেন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে পড়াশোনা শেষ করা সাদিয়া আলম। তাঁর বাসা ভোটকেন্দ্রটির পাশে জাপান গার্ডেন সিটিতে।
ভোট দিয়ে বের হয়ে প্রথম আলোকে বললেন, এবারের ভোট নিয়েও গতকাল রাত থেকে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। ভোটার হওয়ার পরও গত দুই জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। তাই বলা যায়, এবারই তিনি প্রথম ভোটার বা প্রথমবারের মতো ভোট দিলেন। কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভোট দেওয়া শেষ করতে পেরেছেন, এটাই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এই ভোটার।

ভোগান্তিটুকু না থাকলে আনন্দের মাত্রাটা আর একটু বাড়ত
আজ প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনারও শিকার হতে হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাঁদের কথা মনে রেখে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করত, তাহলে আনন্দের মাত্রাটা আর একটু বাড়ত। তারপরও ভোট বলে কথা, তাই এ কষ্টটুকু মেনে নিয়েছেন তাঁরা।
সকাল সোয়া আটটা। মোহাম্মদপুরের বেগম নূরজাহান মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে দেখা হলো হাছন বিবির সঙ্গে। মুখে বলতে গেলে দাঁত একটাও নেই। দুই হাতে ক্রাচ। বয়স কত—জানতে চাইলে মাড়ি বের করে হাসি দিলেন, বললেন, তা তো বলতে পারবেন না।
হাছন বিবি মেয়ের সঙ্গে ভোট দিতে এসেছেন। মেয়ে ভোট দিচ্ছেন, এই ফাঁকে তিনি একাই গেটের বাইরে বের হয়ে এসেছেন। চারতলায় ভোট দিতে গিয়ে কষ্ট হয়েছে, কেন্দ্রের কয়েকজন মিলে তাঁকে চারতলায় তুলে দিয়েছেন আবার নামিয়ে দিয়েছেন বলে জানালেন।

গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন ৮৬ বছর বয়সী মো. আব্দুল লতিফ। শুধু তিনি একা নন, তাঁকে ভোট দেওয়ার জন্য নিয়ে গিয়ে ৭৬ বছর বয়সী স্ত্রী ফিরোজা বেগম এবং ছেলে মাহবুবুর রহমানেরও ঘাম ছুটে যাচ্ছিল। কয়েকজন মিলে হুইলচেয়ার থেকে নামিয়ে ধরে আবদুল লতিফকে বারান্দায় তোলেন। এ সময় আবদুল লতিফের পুরো শরীর কাঁপছিল।
আবদুল লতিফকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে রেখে ছেলে মাহবুবুর রহমান কোন বুথে তাঁর বাবা ভোট দেবেন, তা খোঁজ নিতে যান। হুইলচেয়ারে বসে একটু জিরিয়ে নেওয়ার পর আবদুল লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, এভাবে ভোট দিতে না হলে কষ্টটা একটু কম হতো। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, তারা এ বিষয়টি মাথায় রাখেনি।

কাফরুলের আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন মো. আলী। তিনি পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। এর আগে জাতীয় নির্বাচনে পায়ে হেঁটেই ভোট দিয়েছেন। এবার শারীরিক জটিলতায় হুইলচেয়ারে বসে ভোট দিতে হয়েছে। বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। জানালেন আনসার সদস্যসহ চারজন ধরে তাঁকে চারতলায় তুলেছেন, আবার নামিয়েছেন। এ ছাড়া পুরো ভোট দেওয়ার বিষয়টি আনন্দঘন পরিবেশ ছিল বলে জানালেন।

মো. আলীর সঙ্গে স্ত্রী মাসুদা খাতুন, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে মুনতাসীর রশীদ, মো. আলীর বড় বোন শারমীন আফরোজ, এই বোনের ছেলে ভোটার মাহীনুর রশীদনহ সবাই মিলে ভোট দিতে এসেছেন।
আনন্দ ও ভোগান্তির ভোট দেওয়া ভোটারদের একটাই চাওয়া, যে দলই সরকার গঠন করুক, তাঁরা এখন একটু শান্তি চান। দেশটা ভালো চলুক তা-ই চান।