জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. সাকিব আহম্মেদ তুলন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১-এ এই জবানবন্দি দেন তিনি।পরে তাকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেন।
এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।প্রসিকিউশনের দাবি, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে মেনন ও কামরুল নানা উসকানি দেন। তারা আওয়ামী লীগ সরকার ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পদে থেকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন।তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রে রাজধানীর বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়।
মেনন ও কামরুলের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় ২৩ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা দুজনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
মো. সাকিব আহম্মেদ তুলন জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলনে যোগ দেই। আমি বাড্ডা পোস্ট অফিস রোড এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। এই আন্দোলনে আমরা পুলিশের অনেক বাধার শিকার হই। পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপরে ব্যাপকভাবে টিয়ারশেল ও ছররা গুলি নিক্ষেপ করে। আমাদের আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। রাজপথে টিকতে না পেরে আমি বাসায় চলে যাই। পুলিশের ছররা গুলিতে ওইদিন অনেকেই আহত হয়। মিডিয়াতে দেখেছি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে পুলিশ একজন ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করেছে। আমি বিকেলের দিকে বাসায় চলে যাই।
১৯ জুলাইয়ে ঘটনা উল্লেখ করে তুলন বলেন, শুক্রবার জুমার নামাজের পরে আমি, মারুফ, মারুফের মামা ফয়সাল ও রাজিবসহ আমরা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে মিছিলে অংশগ্রহণ করি। আমি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে থাকা অবস্থায় দেখতে পাই রামপুরা ব্রিজের দিকে যারা যাচ্ছে তাদেরকেই পুলিশ ও বিজিবি গুলি করে মেরে ফেলছে। রামপুরা ব্রিজের সামনে ব্যারিকেড দেওয়া ছিল। সেখানে আমি পাঁচজনকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত অবস্থায় দেখেছি। আমি, মারুফ, ফয়সাল ও রাজিব ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে থেকে রামপুরার ব্রিজের দিকে এগিয়ে যাই। একপর্যায়ে আসর শেষে মাগরিবের আগে রামপুরা ব্রিজের দিক থেকে আসা গুলির একটি প্রকট শব্দ শুনতে পাই। মারুফকে রাস্তার পাশে ফুটপাতের ওপর পড়ে যেতে দেখি। সেখানে একটা ‘স’ মিল আছে। আমি প্রথমে মনে করি মারুফ ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে গেছে। পরে দেখি তার তলপেটে ডান পাশে গুলি লেগেছে। মারুফ আমাকে বলে ‘মামা আমার গুলি লেগেছে আমাকে বাঁচাও’। সে তখন অচেতন হয়ে যায়।
এরপর মারুফকে অ্যাম্বুলেন্সে করে এএমজেড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে সাকিব আহম্মেদ তুলন বলেন, মারুফের অনেক রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। রক্ত থামানোর জন্য গুলিবিদ্ধ স্থানে আমি হাত দিয়ে চেপে ধরি। আমার বাম হাতে একটি ঘড়ি ছিল। রক্তে আমার ঘড়ি ও হাত ভিজে গিয়েছিল। আমার তিন আঙ্গুল ক্ষত স্থানের ভেতরে ঢুকে যায়। তাকে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষতস্থানের রক্তক্ষরণ থামানো যাচ্ছিল না বিধায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন চিকিৎসকরা। আমি, ফয়সালসহ কয়েকজন মিলে মারুফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে রামপুরা ব্রিজের কাছে আমরা বাধার সম্মুখীন হই। পুলিশ ও বিজিবি আমাদের বাধা দেয়। সেখানে আমাদের প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। ততক্ষণে মারুফের অবস্থা প্রায় শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায়। একপর্যায়ে তারা আমাদের অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেয়। আমরা আবুল হোটেল ক্রস করে শান্তিনগর হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পথে শান্তিনগর ব্রিজে উঠার আগে মারুফ মারা যায়। মারুফ তখন আমার বাম হাতের ওপরে ছিল। তারপরও আমরা মারুফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে তুলন বলেন, ইমার্জেন্সিতে গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে আছে, বহু আহত ব্যক্তি আসছে। কিছুক্ষণ পর একজন ডাক্তার এসে মারুফকে পরীক্ষা করে বলেন সে মারা গেছে। তারপরও ডাক্তার তাকে ইসিজি করার জন্য বললে আমরা তাকে ইসিজি রুমে নিয়ে যাই। ইসিজি করার পর নিশ্চিত হই সে মারা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ মর্গে নিয়ে যায়। আমরা পোস্টমর্টেম করে লাশ নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, ওপরের অর্ডার আছে, আমরা একটা লাশও হাসপাতাল থেকে বের হতে দেবো না। সেখানে মারুফের বাবা ছিল। আমরা হাসপাতাল যাওয়ার পথে ওনাকে খবর দিয়েছি। রাত ১২টার দিকে মারুফের বাবাকে হাসপাতাল রেখে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আমরা জানতে পারি, সারাদেশে কারফিউ জারি হয়েছে। আমরা যখন শিল্পকলা একাডেমির সামনে দিয়ে রমনা থানার সামনে যাই, তখন সেখানে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ছিল। তারা আমাদের রিকশা আটকায়। একজন বলে, স্যার এদেরকে গুলি করে দেই। তখন আমরা অনেক ভয় পেয়ে যাই। আরেকজন বলে না স্যার এদেরকে ছেড়ে দেই। মালিবাগ রেল ক্রসিংয়ে থাকা অবস্থায় আমরা রামপুরার দিক থেকে গুলির শব্দ পাই। তখন আমরা খিলগাঁও হয়ে বনশ্রী ফরাজি হাসপাতালের সামনে নামি। সেখান থেকে একটি ব্রিজ পার হয়ে আমরা আফতাবনগর হয়ে বাসায় চলে যাই।
সময় টিভি, আরটিভি এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে তুলন বলেন, ১৯ জুলাই কারফিউর বিষয়ে গণভবনের মিটিংয়ে শেখ হাসিনা, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। তাদের পরামর্শে কারফিউ জারি করে ছাত্র-জনতার ওপর ম্যাসাকার করা হয়। নিরীহ জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে নিহত ও আহত করা হয়। আমি আরও জানতে পারি যে, বাড্ডাসহ আশেপাশের এলাকায় মারুফসহ আরও ২৩ জন ব্যক্তি নিহত হয়। পরে জানতে পারি যে, ১৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ১৪০০ মানুষকে শহীদ করা হয়। যাদের নির্দেশে এবং পরামর্শে কারফিউ জারি করে এই ম্যাসাকার সংঘটিত হয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।