হত্যা মামলা গণমাধ্যম সেনসিটাইজ করলে বিচারকরা চাপে পড়ে গণহারে ফাঁসি দেন

হত্যা মামলা গণমাধ্যম সেনসিটাইজ করলে বিচারকরা চাপে পড়ে গণহারে ফাঁসি দেন

মার্ডার কেস বা হত্যা মামলার মতো ঘটনা মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সেনসেশন তৈরি করা হয়। যখনই এটা সেনসিটাইজড হয়ে যায়, তখনই বিচারকদের ওপর একটা সাংঘাতিক রকমের মানসিক এবং সামাজিক চাপ তৈরি হয়।ফলে তারা গণহারে ফাঁসির রায় প্রদান করেন।

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের পর সোমবার (২৪ আগস্ট) সাংবাদিকদের কাছে এমন মন্তব্য করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে ১০ জন খালাস পেয়েছেন। বাকি ছয়জনের মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং চারজনকে যাবজ্জীবন দিয়েছেন আদালত।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, আমি যে বিষয়টার ওপরে গুরুত্ব দিতে চাই—বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী বা ১৬৪ স্টেটমেন্টে যে ব্যাপক নির্ভরশীলতা, এটা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা। আপনারা দেখেছেন, গুমের মামলার ক্ষেত্রে আমরা যেটা বারবার বলেছি যে গুম এবং এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের ক্ষেত্রে যে আসামিকে গুম করে রাখার পরে জোর করে একটা ১৬৪ পড়িয়ে তাকে কোর্টে প্রডিউস করা হয়।এই ১৬৪ বা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিনির্ভর সাজা দেওয়ার জুরিসপ্রুডেন্স থেকে, এই প্রবণতা থেকে আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে বের করে আনতে হবে। 

‘আজকে হাইকোর্ট ডিভিশনের রায়ের মধ্য দিয়ে এ ব্যাপারে অনেকগুলো ফাইন্ডিং এসেছে, যেগুলো আমাদের এই ১৬৪ নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, নিম্ন আদালতের একটা সেনসেটিভ মার্ডার কেস বা যে কোনো মার্ডার কেসকে সেনসিটাইজ করা হয় মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে। যখনই এটা সেনসিটাইজড হয়ে যায়, তখনই বিচারকদের ওপর একটা সাংঘাতিক রকমের মানসিক এবং সামাজিক চাপ তৈরি হয়। ফলে তারা গণহারে ফাঁসির রায় প্রদান করেন।’

তাজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা অনেকগুলো মামলায় লক্ষ্য করেছি যে এরকম ব্যাপকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রবণতার ব্যাপারে আজকের রায়ে একটা বড় একটা ফাইন্ডিং দিয়ে বলা হয়েছে, এই ধরনের প্রবণতাটা বিপদজনক এবং যে সমস্ত সংশ্লিষ্ট বিচারক এইভাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকেন তাদের আইনের জ্ঞান, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান এবং সেন্টেন্সিংয়ের ব্যাপারে, তাদের যে জ্ঞানের স্বল্পতা, সেটার ব্যাপারে হাইকোর্ট বিভাগ আলোকপাত করেছেন। সংশ্লিষ্ট বিচারককে বিচার কাজ থেকে বিরত রাখার কথা বলেছেন। আমরা মনে করি, এই ব্যাপারে গাইডলাইন থাকা উচিত এবং আমাদের দেশের সেন্টেন্সিং বা যখন অপরাধ প্রমাণিত হলো তার সাজাটা কী হবে সেটার ব্যাপারে কোনো আলাদা আর্গুমেন্টেশন হয় না, দেশের বাইরে কিন্তু এটা হয়।

আরেক আইনজীবী শিশির মনির বলেন, আমরা আগে থেকেই বলেছি, এখনো বলছি- যদি অতিমাত্রায় কোনো ক্রিমিনাল কেসের মিডিয়া ট্রায়াল হয় তাহলে অনেক সময় নিম্ন আদালতের বিচারকদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দ্যাট ইজ হোয়াট ইজ মিডিয়া ট্রায়াল। বিচারের আগেই অনেক সময় টেলিভিশনে বিচার হয়ে যায়। বিচারের আগেই অনেক সময় পাবলিক ডোমেনে বিচার হয়ে যায়। এগুলো হলে প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে দেখেন না অতিমাত্রায় মিডিয়া ট্রায়াল হওয়ার কারণে ১৬ জন মানুষকে ফাঁসি দিয়েছে। হাইকোর্ট ডিভিশনে ১০ জনই খালাস। আর যে বাকি ছয়জনের মধ্যে মাত্র দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন আদালত।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS