বিয়ের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধান কত হওয়া উচিত, এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। কারও সঙ্গে সমবয়সী সঙ্গীর সম্পর্ক যেমন দীর্ঘস্থায়ী ও সুখের হতে পারে, তেমনি ৫, ১০ কিংবা তারও বেশি বছরের বয়সের ব্যবধান থাকা দম্পতিরাও ভালোভাবে সংসার করছেন।সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়সের ব্যবধানের চেয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া, বিশ্বাস ও মানসিক পরিপক্বতাই দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি শক্ত করে।
৫ থেকে ৭ বছরের ব্যবধান কি আদর্শ?
দম্পতির বয়সের ব্যবধান ৫ থেকে ৭ বছর হলে অনেক ক্ষেত্রে মানসিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।এতে জীবনযাপন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয় তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
তবে এটিকে কোনো চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।কারণ একই বয়সের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দুই মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনে বড় পার্থক্য থাকতে পারে।
১০ বছরের ব্যবধানেও হতে পারে সুখী সংসার
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ১০ বছরের বয়সের ব্যবধান থাকলেও সম্পর্ক সফল হতে পারে।এ ক্ষেত্রে দুজনের মূল্যবোধ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জীবনযাপনের লক্ষ্য কাছাকাছি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বয়সে বড় একজন যেন সম্পর্কের ওপর একতরফা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা না করেন, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
আর বয়সের ব্যবধান ২০ বছর বা তার বেশি হলে জীবনযাপন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিংবা প্রজন্মগত চিন্তাভাবনায় পার্থক্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মান থাকলে এমন ব্যবধানও দাম্পত্য জীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
বয়স নয়, সম্পর্কের ভিত্তিই আসল
দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্ব শুধু বয়সের ব্যবধান দিয়ে বিচার করা যায় না। পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান, খোলামেলা যোগাযোগ, কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে থাকা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে একই ধরনের ভাবনা, এসব বিষয় সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে বড় ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ বয়সের ব্যবধান ৫ থেকে ৭ বছর হলেই যে সংসার সুখের হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার ১০ কিংবা ২০ বছরের ব্যবধান থাকলেই সম্পর্ক ব্যর্থ হবে, এমনটিও নয়। শেষ পর্যন্ত দুজন মানুষের মানসিক মিল ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনায় বয়স গুরুত্বপূর্ণ
দাম্পত্যের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধানের পাশাপাশি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কারণ নারী ও পুরুষের প্রজননক্ষমতা বয়সের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
দেওয়া তথ্যানুযায়ী, পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সকে সন্তান নেওয়ার জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল সময় হিসেবে ধরা হয়। ৩৫ বছরের পর শুক্রাণুর গুণমান কমতে শুরু করতে পারে এবং বয়স আরও বাড়ার সঙ্গে প্রজননক্ষমতায় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
নারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বয়সে প্রজননক্ষমতা বেশি থাকে। ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সকে সন্তান ধারণের জন্য অনুকূল সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীর প্রজননক্ষমতা কমতে থাকে এবং ৪০ বছরের পর গর্ভধারণে বিভিন্ন ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বিয়ের পর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে শুধু বয়সের ব্যবধান নয়, দুজনের বয়স ও প্রজননস্বাস্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
২০১৭ সালের একটি অস্ট্রেলীয় গবেষণায় বয়সের ব্যবধানের সঙ্গে দাম্পত্য সন্তুষ্টির সম্পর্কের কিছু দিক উঠে আসে। সেখানে দেখা যায়, যেসব দম্পতির বয়সের ব্যবধান এক থেকে তিন বছর এবং পুরুষ সঙ্গী বয়সে বড়, তাদের সন্তুষ্টির মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল।
অন্যদিকে বিয়ের ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা গেছে, বিচ্ছিন্ন হওয়া দম্পতিদের একটি বড় অংশের বয়সের ব্যবধান ছিল ৭ বছর বা তার বেশি। তবে এই ফলাফলকে কোনো চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বয়সের ব্যবধান বেশি থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন সুখী দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন, এমন উদাহরণও রয়েছে।
বয়সে নারী বড় হলেও সমস্যা নয়
দাম্পত্য সম্পর্কে পুরুষের বয়স বেশি হওয়াই যে নিয়ম, এমন ধারণাও এখন অনেকটাই বদলেছে। অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে নারী বয়সে বড় হয়েও সফলভাবে সংসার করছেন।
এক সাক্ষাৎকারে মডেল ইলিলি জানান, তার ৫৩ বছর বয়সী বাবা ভেঙ্কট রমণ ও ৪৩ বছর বয়সী মা পূর্ণিমা ২১ বছর ধরে সুখী দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধান কোনো সমস্যা তৈরি করেনি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিয়ের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই সম্পর্কের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। একসঙ্গে পথ চলার ইচ্ছা, পারস্পরিক যত্ন, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং মানসিক বন্ধন শক্ত থাকলে বয়সের ব্যবধান অনেকটাই গৌণ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সুখী দাম্পত্যের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, দুজন মানুষ একে অপরকে কতটা বুঝতে এবং সম্মান করতে পারছেন।