ম্যানচেস্টার সিটিতে পেপ গার্দিওলার শেষ বছরগুলো নিয়ে নির্মিত একটি নতুন তথ্যচিত্র ম্যানেজার ও দলের প্রধান খেলোয়াড়দের মধ্যেকার চরম উত্তপ্ত মুহূর্তগুলো জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর প্রযোজনা ‘এ বিউটিফুল অবসেশন’-এর একটি দৃশ্যে দেখা যায়, ওয়েম্বলিতে ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে এফএ কাপ ফাইনালের বিরতির সময় নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডকে কঠোরভাবে তিরস্কার করছেন এই সাবেক সিটি কোচ।
গার্দিওলা শুরুতে হালান্ডকে জিজ্ঞেস করেন তিনি ক্লান্ত কি না। স্ট্রাইকার তা অস্বীকার করলে গার্দিওলা উচ্চস্বরে তার কাছে খেলায় আরও মনোযোগী হতে বলেন।তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘কেন তুমি বলের জন্য সেভাবে লড়ছ না যেভাবে ওই অভিশপ্ত ফাইনালে সালিবা এবং অন্য খেলোয়াড়দের বিপক্ষে লড়েছিলে? যদি ক্লান্ত হও, তবে এখনই বলো। আমি ছয়জন খেলোয়াড়কে দলের বাইরে রেখে এসেছি যাদের জন্য আমি লজ্জিত।কোথায় তোমার সেই মান? রক্ষণভাগের পেছনে তোমার মুভমেন্ট আর পেনাল্টি বক্সে তোমার দাপট কোথায়?’
এর পরপরই গার্দিওলা তার সুর কিছুটা নরম করেন, কিন্তু নিজের দাবিতে অনড় থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো তোমাকে বাবার মতো ভালোবাসি, আর্লিং।আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু মূল বিষয় সেটি নয়। দেখিয়ে দাও যে তুমি জিততে চাও।’
হালান্ডের সাথে এই কথোপকথনটি তথ্যচিত্রের তৃতীয় পর্বে দেখানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে চার পর্বের এই সিরিজটি মুক্তি পাবে। এতে গার্দিওলার সিটিতে কাটানো শেষ মৌসুমগুলোর পর্দার অন্তরালের নানা ঘটনা এবং ড্রেসিংরুমের সেই সব তেজস্বী বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে যা আগে কখনো বাইরের পৃথিবী জানতে পারেনি।
অন্য একটি অংশে দেখা যায়, অ্যানফিল্ডে লিভারপুলের কাছে হারের পর তৎকালীন অধিনায়ক কাইল ওয়াকারের সাথে তর্কে জড়িয়েছেন কোচ। গার্দিওলা ওয়াকারের ভুল পাস বা বল হারানোর সমালোচনা করলে ওয়াকার অভিযোগ করেন যে দলের প্রতিটি মিটিংয়ে তার নাম তুলে তাকে ছোট করা হয়। ওয়াকার বলেন, ‘আপনি প্রতিটি মিটিংয়ে আমার নাম নেন, প্রতিটি মিটিংয়ে শুধু আমার নাম।’ জবাবে গার্দিওলা বলেন, ‘হয়তো এ কারণেই যে তুমি দলের অধিনায়ক।’
তথ্যচিত্রের দৃশ্যগুলো কোচের জীবনের অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও আবেগঘন কিছু অধ্যায়ও উন্মোচন করেছে। ২০২৪/২৫ মৌসুমে সিটির একটি খারাপ সময়ের মধ্যে গার্দিওলা খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে নিজের দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি নিয়ে কথা বলেন এবং তাদের মধ্যে ফুটবলীয় আবেগ ফিরিয়ে আনতে নিজের সম্পর্কের উদাহরণ টেনে আনেন।
তিনি বলেন, ‘আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী, আমার স্ত্রী তথা আমার সাবেক স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হয়েছি। আমি তাকে অনেক ভালোবাসি, কিন্তু আমাদের মধ্যে সেই আবেগ বা প্যাশন হারিয়ে গিয়েছিল। আমি কি তাকে ভালোবাসি? হ্যাঁ। সে কি আমাকে ভালোবাসে? হ্যাঁ, কিন্তু আমরা সেই টান হারিয়ে ফেলেছি। জীবনে যাই করো না কেন, তা আবেগ দিয়ে করো। আমি কেবল ভালো খেলোয়াড় চাই না, আমি এমন খেলোয়াড় চাই যাদের মনে জয়ের তীব্র নেশা আছে।’
গার্দিওলার কোচিং স্টাফের দীর্ঘদিনের সদস্য মানুয়েল এসতিয়ার্তে এই তথ্যচিত্রে স্মৃতিচারণ করেন যে, কোচের আচরণের এই খিটখিটে ভাব বা পরিবর্তন যে তার ব্যক্তিগত জীবনের চরম যন্ত্রণার সাথে সম্পর্কিত ছিল, তা তিনি নিজে খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
এই তথ্যচিত্রে গার্দিওলার সাথে ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের মতবিরোধও ফুটে উঠেছে। একটি ম্যাচে কোচ শুরুর একাদশে দশটি পরিবর্তন আনলে সিইও ফেরান সোরিয়ানো এবং প্রেসিডেন্ট খালদুন আল মুবারকের কণ্ঠস্বর সম্বলিত ভয়েস মেসেজে এই সিদ্ধান্তের প্রতি তাদের চরম বিরক্তি ও ক্রোধ প্রকাশ পায়।
ড্রেসিংরুমের অন্য একটি কঠোর বক্তব্যে গার্দিওলা সাফ জানিয়ে দেন যে, যারা তার সিদ্ধান্তে অখুশি তাদের তিনি এক বিন্দুও বরদাশত করবেন না। এই স্প্যানিশ কোচ বলেন, ‘মৌসুম শেষে যদি আমি কারো মুখে বিষণ্ণতা দেখি, তবে আমি তোমাদের খুন করে ফেলব। যখন দেখব তোমরা আমার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছ, তখন আমি তোমাদের মেরেই ফেলব।’ এরপর তিনি দাবি করেন যে, প্রতিটি খেলোয়াড়কে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তারা শুরুর একাদশে থাকার যোগ্যতা রাখেন।
তথ্যচিত্রটির সমাপ্তি ঘটে গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা খেলোয়াড়দের জানানোর মাধ্যমে। এই কিংবদন্তি ম্যানেজার জানান যে ব্যক্তিগত এবং পেশাদার জীবনের এক অস্থির সময়ের পর তার এখন নিজেকে ফিরে পেতে বিরতি নেওয়া প্রয়োজন।
বিদায়বেলায় তিনি বলেন, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করো না আমি কেন চলে যাচ্ছি। এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই, তবে মনের গভীরে আমি জানি আমার সময় শেষ হয়েছে। আমার অনেক কিছু নতুন করে সাজানো দরকার। আমার ব্যক্তিগত জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে এবং পেশাগতভাবেও আমার নতুন অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। সর্বোপরি, আমার এখন কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া আর কেবল সময়কে বয়ে যেতে দেখা দরকার।’