ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে স্কটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এসএফএ)। আগামী ফিফা নির্বাচনে সভাপতি পদে তাকে আর কোনো ভোট দেওয়া হবে না বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি স্পোর্টকে সাফ জানিয়েছেন এসএফএ-এর প্রধান নির্বাহী ইয়ান ম্যাক্সওয়েল।
বিশ্বকাপসহ ফিফার সকল প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক ও টিকিটের স্বত্ব পরিচালনার জন্য একটি নতুন কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া এবং তার ২১ শতাংশ শেয়ার একটি বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করার চেষ্টার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র চাপের মুখে পড়েন ইনফান্তিনো। পরবর্তীতে এই পরিকল্পনা বাতিল করতে হলেও বিতর্ক থামেনি।
‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামের এই প্রকল্পটি নিয়ে উয়েফাসহ একাধিক কনফেডারেশনের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়, এমনকি উয়েফা ফিফার সকল প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকিও দেয়।
বেলজিয়ামের সেবাস্তিয়ান পোকোনোলিকে স্কটল্যান্ডের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার অনুষ্ঠানে ম্যাক্সওয়েল বলেন, ‘উয়েফার ৫৫টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠকের পর থেকেই এসএফএ-এর অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট।
আমরা উয়েফার অবস্থানের সঙ্গেই একাত্মতা প্রকাশ করেছি এবং একটি কণ্ঠস্বরের চেয়ে ৫৫টি দেশের কণ্ঠস্বর অনেক বেশি শক্তিশালী।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘উয়েফার সেই বিবৃতিতে ফিফা নেতৃত্বের প্রতি আস্থার অভাবের কথা বলা হয়েছে এবং স্কটিশ এফএ সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে পুরোপুরি একমত।
২০২৭ সালের শুরুর দিকে হতে যাওয়া পুনর্নির্বাচনে এসএফএ জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ভোট দেবে না।’
এসএফএ সভাপতি মাইক মুলরানে ফিফার অর্থ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তারা এতদিন প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর বিরোধিতা করতে পারেনি; এমন গুঞ্জন নাকচ করে দেন ম্যাক্সওয়েল। ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোও ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা ইনফান্তিনোর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আগামী মার্চে চতুর্থ মেয়াদের জন্য সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা রয়েছে ইনফান্তিনোর।
গত সপ্তাহে উয়েফা, কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এক যৌথ খোলা চিঠিতে ফিফা ও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘প্রতারণার মাধ্যমে আস্থা ভঙ্গের’ অভিযোগ আনে। তিন আঞ্চলিক গভর্নিং বডির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়, এফএফই প্রস্তাব নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কটি মূলত ‘ফুটবলের সততা এবং ফুটবল পরিচালনার জন্য নির্বাচিতদের সততার ওপর বড় আঘাত।’
বিবৃতিতে সরাসরি ইনফান্তিনোর নাম উল্লেখ করা না হলেও বিবিসি স্পোর্টকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, এটিকে ইনফান্তিনোর জন্য পদত্যাগ করে সসম্মানে বিদায় নেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কাউন্সিলের পরবর্তী সভায় এফএফই নিয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফিফা। তবে তিন কনফেডারেশনের মতে, ‘বিচক্ষণতার এমন চরম ঘাটতির মুখে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কোনো তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে তদন্ত না করানো সুশাসনের পরিপন্থী।’ একই সঙ্গে বাতিল হওয়া এই পরিকল্পনা সংক্রান্ত কোনো নথি যেন মুছে বা নষ্ট না করা হয়, সে বিষয়ে উয়েফার দেওয়া আইনি সতর্কবার্তাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিবিসি স্পোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ইনফান্তিনো পদে বহাল থাকলে সমান্তরাল বা বিকল্প কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করা যায় কি না, তা নিয়ে তিন কনফেডারেশনের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। যদিও মূল আলোচনা এখনও শুরু হয়নি। সভাপতি পদের জন্য আগামী ১৮ নভেম্বরের ডেডলাইনের আগে এখন পর্যন্ত ইনফান্তিনোর বিপক্ষে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করেননি।
এই ইস্যুতে বিশ্ব ফুটবল কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ওশেনিয়া কনফেডারেশনগুলো ইনফান্তিনোকে সমর্থন দিয়েছে। তবে কনফেডারেশনগুলোর ভেতরেও বিভক্তি স্পষ্ট, যার ফলে লড়াইয়ে ইনফান্তিনো নাকি তার বিরোধীরা এগিয়ে আছেন, তা অনুমান করা বেশ কঠিন।
ওশেনিয়ার ১১টি সদস্য দেশের মধ্যে নিউজিল্যান্ড জানিয়েছে তারা কনফেডারেশনের সিদ্ধান্ত মেনে ইনফান্তিনোকে ভোট দেবে না। কনকাকাফের ৩৫টি সদস্য দেশের মধ্যে মেক্সিকো, গ্রেনাডা এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস বাকি ৩২ দেশের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ফিফা সভাপতিকে সমর্থন জানিয়েছে।
অন্যদিকে, এশিয়ান কনফেডারেশনের ৪৬টি সদস্যের মধ্যে আটটি দেশ- সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, শ্রীলঙ্কা, লেবানন, কুয়েত, মঙ্গোলিয়া, ফিলিপাইন ও ভুটান ইনফান্তিনোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ৩৬ সদস্যের ফিফা কাউন্সিলেও একই ধরনের বিভক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ফলে ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের ভোটে যদি ইনফান্তিনো নির্বাচনে জিতেও যান, ফিফা পরিচালনা করার মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ তার থাকবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। এদিকে উয়েফার বয়কট হুমকির প্রথম পরীক্ষা হতে যাচ্ছে তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে, যখন পোল্যান্ডের মাটিতে শুরু হতে যাচ্ছে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ। সেই আসরে ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের আরও পাঁচটি দেশ অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।