মাত্র ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছে নিজেদের আগের বিশ্বরেকর্ড ভেঙেছে চীনের একটি পরীক্ষামূলক ম্যাগলেভ ট্রেন। হুবেই প্রদেশের দুংহু ল্যাবরেটরির এক কিলোমিটার দীর্ঘ পরীক্ষামূলক ট্র্যাকে এই নজির গড়েছে ১ দশমিক ১ টন ওজনের পরীক্ষামূলক ট্রেনটি।চীনা গবেষকদের এই সাফল্য ভবিষ্যতের অতি উচ্চগতির পরিবহনব্যবস্থা এবং মহাকাশ প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
চীনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর পরীক্ষাটি চালানো হয়।মাত্র এক কিলোমিটার দীর্ঘ ট্র্যাকে ট্রেনটি প্রায় ৬০০ মিটার অতিক্রম করার মধ্যেই ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটারের সর্বোচ্চ গতি অর্জন করে। এরপর নিয়ন্ত্রিতভাবে থেমেও যায়।পুরো পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয় প্রায় আট সেকেন্ডে।
ম্যাগলেভ বা চৌম্বকীয় ভাসমান ট্রেনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি চৌম্বক শক্তির সাহায্যে প্রচলিত রেললাইনের ওপর ভেসে চলে।ফলে ট্রেন ও লাইনের মধ্যে সরাসরি ঘর্ষণ থাকে না। লাইনের কয়েল ও তড়িৎ-চৌম্বকীয় শক্তির সমন্বয়ে তৈরি প্রবল বল ট্রেনকে সামনে এগিয়ে নেয়। এতে প্রচলিত চাকার ঘর্ষণজনিত সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কমে যায়।
চীনা গবেষকেরা শুধু অতি দ্রুত গতি অর্জনই করেননি, ট্রেনটিকে উচ্চগতির পর নিয়ন্ত্রিতভাবে থামানোর সক্ষমতাও পরীক্ষা করেছেন। পরীক্ষায় উচ্চগতির লেভিটেশন বা ভেসে থাকার স্থিতিশীলতা, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি ব্রেক ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে।
ছয় মাসে তৃতীয়বার বিশ্বরেকর্ড
একই পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মে ছয় মাসের মধ্যে এটি তৃতীয় বিশ্বরেকর্ড। ২০২৫ সালের জুনে দুংহু ল্যাবরেটরির পরীক্ষামূলক ট্রেন ৭ দশমিক ১ সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৬৫০ কিলোমিটার গতি অর্জন করে প্রথম রেকর্ড গড়ে। পরে জুলাইয়ে সেটি ঘণ্টায় ৭০০ কিলোমিটার গতি অর্জন করে। এবার ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটারে পৌঁছে আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেল।
চীনা গবেষকদের এ ধারাবাহিক সাফল্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা শুধু একটি দ্রুতগতির যান তৈরি করছেন না; বরং অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ, তড়িৎ-চৌম্বকীয় প্রপালশন, লেভিটেশন নিয়ন্ত্রণ, উচ্চগতিতে স্থিতিশীলতা এবং জরুরি ব্রেকিং ব্যবস্থা একসঙ্গে উন্নত করার চেষ্টা করছেন।
যাত্রী বহনের জন্য এখনো প্রস্তুত নয়
তবে এই পরীক্ষামূলক ট্রেনকে এখনই যাত্রী বহনের উপযোগী বলা যাবে না। এটি মূলত গবেষণা ও প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এত দ্রুত গতি অর্জনের সময় যে তীব্র ত্বরণ তৈরি হয়, তা সাধারণ যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
চীনের গবেষকদের লক্ষ্য শুধু যাত্রীবাহী ট্রেনের গতি বাড়ানো নয়। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অতি উচ্চগতির পরিবহনব্যবস্থা, মহাকাশযান উৎক্ষেপণ এবং উচ্চগতির উড্ডয়ন-প্রযুক্তির পরীক্ষায়ও কাজে লাগতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
বাণিজ্যিক ম্যাগলেভের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি
বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ম্যাগলেভ ট্রেনের গতি পরীক্ষামূলক এই যানটির তুলনায় অনেক কম। চীনে বাণিজ্যিক ম্যাগলেভ ট্রেন ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে। চীন ইতিমধ্যে ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার গতির নতুন প্রজন্মের ম্যাগলেভ ট্রেনের প্রোটোটাইপও তৈরি করেছে।
অর্থাৎ নতুন পরীক্ষায় অর্জিত ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতি বর্তমানে প্রচলিত বাণিজ্যিক ম্যাগলেভের গতির তুলনায় অনেক বেশি। তবে পরীক্ষামূলক গতি আর যাত্রী পরিবহনের নিরাপদ বাণিজ্যিক গতি এক বিষয় নয়-এই ব্যবধান কমাতেই আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও পরীক্ষা প্রয়োজন।
রকেট উৎক্ষেপণেও কাজে লাগতে পারে
অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তির আরেকটি সম্ভাব্য ব্যবহার মহাকাশ গবেষণা। চীনা গবেষকেরা তড়িৎ-চৌম্বকীয় শক্তি ব্যবহার করে রকেট বা মহাকাশযানকে উৎক্ষেপণের প্রাথমিক পর্যায়ে বাড়তি গতি দেওয়ার প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন। এর লক্ষ্য হলো, প্রচলিত রাসায়নিক জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎক্ষেপণের শুরুতেই বৈদ্যুতিক শক্তির সাহায্যে যানকে দ্রুত গতিতে নিয়ে যাওয়া।
এ ছাড়া চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও অতি উচ্চগতির সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগলেভ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের এক পরীক্ষায় প্রায় এক টন ওজনের একটি পরীক্ষামূলক যান মাত্র দুই সেকেন্ডে ঘণ্টায় প্রায় ৭০০ কিলোমিটার গতি অর্জন করেছিল।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তি বাস্তবে যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করতে হলে এখনো বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল অবকাঠামোগত ব্যয়, দীর্ঘ দূরত্বে অত্যন্ত নিখুঁত ট্র্যাক নির্মাণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উচ্চগতিতে যাত্রীদের ওপর ত্বরণের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং পুরো ব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।
চীনা বিজ্ঞানীরা একই সঙ্গে কম চাপের টিউব বা প্রায় বায়ুশূন্য পরিবেশে ম্যাগলেভ যান চালানোর প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা করছেন। তাত্ত্বিকভাবে এমন ব্যবস্থায় বায়ুর বাধা অনেক কমে গেলে আরও বেশি গতি অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফলে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতির এই পরীক্ষা এখনই নতুন প্রজন্মের যাত্রীবাহী ট্রেনের সূচনা নয়। তবে কম দূরত্বে অতি উচ্চগতিতে যানকে ত্বরান্বিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে থামানোর প্রযুক্তি সফলভাবে প্রদর্শনের মাধ্যমে চীন উচ্চগতির পরিবহন ও মহাকাশ প্রযুক্তির গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এগিয়েছে।
সূত্র: সিনহুয়া