জাপানের রাজধানী টোকিও সংলগ্ন চিবা প্রিফেকচারে নজিরবিহীন ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।এতে অন্তত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে ২০ হাজারের বেশি বাড়িঘর।
অন্যদিকে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন প্রায় ৭ হাজার যাত্রী। শুক্রবারও অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত ছিল।
বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে চিবা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রতি ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। চিবা শহরে ২৪ ঘণ্টায় ৩৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা ২০১৩ সালের অক্টোবরের ৩০৯ মিলিমিটারের আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।জাপানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ভারী বৃষ্টির ঘটনাগুলোর একটি।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে শীতল বাতাসের মিশ্রণে ওই এলাকায় তীব্র বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। তারই প্রভাবে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়।
চিবার গভর্নর তোশিহিতো কুমাগাই পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জীবনে বহু দুর্যোগ মোকাবিলা করলেও এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি।
সর্বোচ্চ সতর্কতা, হাজারো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া
ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার চিবার একাধিক এলাকায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় শুক্রবার সকালে ওই সতর্কতা কমিয়ে আনা হলেও নদী উপচে প্লাবন ও ভূমিধসের ঝুঁকি এখনো রয়েছে।
দুর্যোগের আগে ও পরে দুই লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটিয়েছেন। চিবা শহরের কিছু আশ্রয়কেন্দ্রে শত শত মানুষ রাত কাটান। উদ্ধারকাজে জাপানের স্থল আত্মরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
সড়ক-রেল যোগাযোগ বিপর্যস্ত
অতিবৃষ্টিতে চিবার বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যায়। অনেক গাড়ি পানিতে আটকা পড়ে। রেলপথেও পানি ওঠায় একাধিক ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। কিছু রেলসেবা শুক্রবার পুনরায় চালু হলেও ধীরগতিতে চলাচল করছিল। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
দুর্যোগে বিদ্যুৎ সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, ২০ হাজারের বেশি বাড়িঘর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
নারিতা বিমানবন্দরে দুর্ভোগ
প্রবল বৃষ্টি ও যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় বৃহস্পতিবার রাতে নারিতা বিমানবন্দরে প্রায় ৭ হাজার যাত্রী আটকা পড়েন। অনেক যাত্রীকে বিমানবন্দরেই রাত কাটাতে হয়েছে। তাদের জন্য কম্বল, পানি ও খাবারের ব্যবস্থা করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার সকালে কিছু রেলসেবা চালু হওয়ায় আটকা পড়া যাত্রীদের একটি অংশ বিমানবন্দর ছাড়তে শুরু করেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অধিকাংশ ফ্লাইট স্বাভাবিকভাবে চলাচলের কথা থাকলেও কিছু ফ্লাইটে বিলম্ব হতে পারে।
প্রাণহানি ও উদ্ধার তৎপরতা
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রথমদিকে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও শুক্রবারের মধ্যে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮ জনে দাঁড়িয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে এমন একজনও রয়েছেন, যার গাড়ি বন্যার পানিতে ডুবে যায়। বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধস ও পানিতে আটকে পড়া মানুষের উদ্ধারে কাজ করছে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো।
চিবার বিভিন্ন শহরে কাদা ও পানিতে ডুবে থাকা বাড়িঘর, সড়ক ও রেলপথের দৃশ্য দেখা গেছে। দুর্যোগের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, কয়েকটি এলাকায় রাতারাতি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে হয়েছে।
চরম আবহাওয়ার এই ঘটনায় জাপানের অবকাঠামো ও দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থার ওপরও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টি কিছুটা কমলেও নতুন করে বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
সূত্র: রয়টার্স,এনএইচকে ও আসাহি শিমবুন