না ফেরার দেশে ইতালির বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি ফ্রাঙ্কো বারেসি

না ফেরার দেশে ইতালির বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি ফ্রাঙ্কো বারেসি

ইতালীয় ফুটবলের কিংবদন্তি ও এসি মিলানের আইকনিক ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসি ৬৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। তার মৃত্যুতে বিশ্ব ফুটবলে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।মিলান এবং ইতালি জাতীয় দলের জার্সিতে তার অসামান্য অবদান ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

বারেসি টানা ২০টি মৌসুম এসি মিলানের রক্ষণভাগ আগলে রেখেছেন।ক্লাবটির হয়ে তিনি মোট ৭১৯টি ম্যাচ খেলেছেন। তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি ৬টি সিরি-এ শিরোপা এবং ৩টি ইউরোপীয় কাপ (বর্তমানে যা চ্যাম্পিয়নস লিগ নামে পরিচিত) জয়ের অনন্য গৌরব অর্জন করেন।

ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ইতালি জাতীয় দলের হয়ে ৮১টি ম্যাচ খেলা এই তারকা ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন।১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালেও তিনি ইতালির রক্ষণভাগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

এসি মিলানের ইতিহাসে বারেসির নাম এতটাই মিশে আছে যে, ১৯৯৭ সালে তার অবসরের পর ক্লাবটি সম্মান জানিয়ে তার আইকনিক ‘৬ নম্বর’ জার্সিটি চিরতরে তুলে রাখে (রিটায়ার্ড)। এর দুই বছর পর ভক্ত ও ক্লাবের ভোটে তিনি মিলানের ‘শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হন।

পারিবারিকভাবেও ফুটবল ছিল তার রক্তে। ফ্রাঙ্কো বারেসি ছিলেন জুসেপ্পে বারেসির ছোট ভাই। মজার বিষয় হলো, ফ্রাঙ্কো যখন মিলানের অধিনায়ক, তার বড় ভাই জুসেপ্পে ছিলেন নগর প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টার মিলানের অধিনায়ক। জুসেপ্পে ১৮ মৌসুমে ইন্টারের হয়ে ৪০০-এর বেশি ম্যাচ খেলেছেন।

শুক্রবার এক শোকবার্তায় এসি মিলান জানিয়েছে, ‘ফ্রাঙ্কো বারেসির প্রয়াণে মিলানের পুরো ইতিহাস আজ অশ্রুসিক্ত। তার আদর্শ ও সততা এই ক্লাবের ডিএনএ-তে চিরকাল খোদাই করা থাকবে, ঠিক যেমন আমাদের হৃদয়ে মিশে আছে তার সেই আইকনিক ৬ নম্বর জার্সিটি।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এই অত্যন্ত কঠিন সময়ে ফ্রাঙ্কো বারেসির শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে মিলান। প্রতিটি ‘রোসোনেরি’ (মিলান ভক্ত) এই অপূরণীয় ক্ষতিকে নিজেদের ব্যক্তিগত শোক হিসেবে অনুভব করছে।’

ইতালির আরেক ঐতিহ্যবাহী ক্লাব জুভেন্টাস তাদের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে লিখেছে, ‘কিছু মানুষ তাদের প্রতিভা দিয়ে ইতিহাস গড়েন, আর কিছু মানুষ তাদের মনুষ্যত্ব দিয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকেন। ফ্রাঙ্কো বারেসি ছিলেন এই দুইয়েরই বিরল সংমিশ্রণ।’

জুভেন্টাস আরও যোগ করেছে, ‘মাঠের ভেতরে ও বাইরে তার নেতৃত্ব, খেলার ধরণ এবং সম্মানবোধ প্রজন্মের পর প্রজন্মের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের জন্য অনুপ্রেরণা। ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তার স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকবে। এই গভীর শোকের মুহূর্তে জুভেন্টাস ফুটবল ক্লাব বারেসি পরিবার ও এসি মিলানের পাশে রয়েছে।’

নাপোলি তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছে, ‘আমাদের সভাপতি অরেলিও ডি লরেন্টিস, কোচ ম্যাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রি এবং নাপোলি পরিবার ফ্রাঙ্কো বারেসির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে। তিনি ছিলেন মিলান তথা সমগ্র ইতালীয় ফুটবলের এক অবিস্মরণীয় কিংবদন্তি ও আলোকবর্তিকা।’

ইতালীয় লিগ সিরি এ-এর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফ্রাঙ্কো বারেসির মৃত্যুতে সিরি এ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। এই দুঃখজনক মুহূর্তে আমরা তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’

বারেসি মিলানের তিনটি সোনালী যুগের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। প্রথমে ‘স্কাডেত্তো ডেলা স্টেলা’ দল, এরপর সাক্কির ‘ইমমর্টালস’ (অমর) এবং সবশেষে ক্যাপেলোর ‘ইনভিন্সিবলস’ (অজেয়)। তিনি তার ক্যারিয়ারের আমূল পরিবর্তনের পেছনে কোচ নীলস লিডহোমের অবদানের কথা সবসময় কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করতেন। এই সুইডিশ কোচই ১৯৭৮ সালে তাকে অভিষিক্ত করেন এবং ১৯৮৪ সালে ফুটবলে ‘জোনাল মার্কিং’ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।

সেই সময়ে ইতালির রক্ষণভাগ ছিল মূলত ‘ম্যান-টু-ম্যান’ মার্কিং নির্ভর, যেখানে একজন লিবেরো সবার পেছনে থাকতেন। এই কৌশলের পরিবর্তন বারেসিকে তার প্রতিভার পূর্ণ বিকাশে সাহায্য করে এবং পরবর্তীতে কোচ আরিগি সাক্কির অধীনে মিলান বিশ্ব ফুটবলে এক বৈপ্লবিক আধিপত্য তৈরি করে।

নিজের স্মৃতিকথায় বারেসি লিখেছিলেন, ‘শারীরিকভাবে আমি খুব বেশি দীর্ঘদেহী ছিলাম না, যা ম্যান-টু-ম্যান মার্কিংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রতিকূল ছিল। তবে আমি আগ্রাসী মনোভাব এবং প্রতিপক্ষের চাল আগেভাগে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতার মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করতাম। লিডহোমের অধীনেই আমি পুরনো ধাঁচের লিবেরো থেকে আধুনিক সেন্ট্রাল ব্যাক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলি।’

সাক্কির অধীনে মিলানের অফসাইড ট্র্যাপ এবং মুহুর্মুহু প্রেসিং ফুটবল খেলার জগতকে চিরতরে বদলে দেয়। ক্লাবের নতুন মালিক সিলভিও বার্লুসকোনির জাঁকজমকপূর্ণ দর্শন মিলানকে ১৯৮৯ এবং ১৯৯০ সালে টানা দুবার ইউরোপীয় কাপ জিততে সাহায্য করে। ২০১৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদ এই কীর্তি পুনরাবৃত্তি করার আগ পর্যন্ত কোনো ক্লাবই টানা দুবার এই শিরোপা জিততে পারেনি।

সাক্কি যখন জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে চলে যান, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন মিলানের আধিপত্যের অবসান ঘটবে। কিন্তু এরপর ফাবিও ক্যাপেলোর অধীনে মিলান টানা ৫৮টি লিগ ম্যাচে অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ে এবং ১৯৯৪ সালে আবারও ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জয় করে। বারেসির সেই অজেয় রক্ষণভাগ আজও ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম দেয়াল হিসেবে পরিচিত।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS