প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে টানা হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ইরানে তাদের বিমান হামলা স্থগিত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসা, সামরিক অভিযানে সীমিত সাফল্য এবং নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ—এই তিনটি বিষয়ই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের সর্বশেষ পর্যায় শুরু হওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে টানা হামলা চালানোর পর প্রথমবারের মতো ইরানের বিরুদ্ধে রাতের সামরিক অভিযান বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই বিরতি ইতোমধ্যে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলায় প্রশ্ন উঠেছে, ওয়াশিংটন কি কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোচ্ছে, নাকি এটি আরও বড় সামরিক অভিযানের আগে কেবল কৌশলগত বিরতি?
যদিও টানা দুই দিন ধরে উভয় পক্ষই সরাসরি কোনো হামলা চালায়নি, তবু সংঘাত যে শেষ হয়ে গেছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এখনও বহাল রয়েছে। হরমুজ প্রণালীর আশপাশে ইরানি বাহিনীও শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।পাশাপাশি উভয় দেশের কর্মকর্তারাই জানিয়ে আসছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প এখনও খোলা রয়েছে।
পেন্টাগন ও ট্রাম্প কি একই অবস্থানে?
এই বিরতির পেছনে মূল কারণ ছিল শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সামরিক পর্যালোচনা বৈঠক।সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযানের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
শুক্রবার বিকেলে তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রয়োজনে হামলা চালাতে আমাদের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন। তবে আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তাই পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’
এর আগের দিন অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও কঠোর ভাষায় বলেছিলেন, ‘আমি আরও বড় ধরনের হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছি, এতদিনের যেকোনো হামলার চেয়ে বড়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি আছি। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’
তবে বৈঠকের অভ্যন্তরীণ আলোচনা ছিল ভিন্ন। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পকে বাস্তব সামরিক পরিস্থিতির এমন একটি চিত্র তুলে ধরা হয়, যা তার প্রকাশ্য বক্তব্যের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ছিল।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় আকারের বিমান হামলা চালাতে সক্ষম।
তবে তার উদ্বেগ ছিল হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে নয়; বরং এমন অভিযান চালালে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা অবস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে।
আলোচনার বিষয়ে অবহিত কর্মকর্তাদের মতে, কেইন সতর্ক করেন যে নতুন করে বড় ধরনের বোমাবর্ষণ শুরু হলে বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে এসব ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলো রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দায়িত্বাধীন এলাকায় জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলো রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় এসব স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে।
কেইনের কার্যালয় প্রেসিডেন্টকে দেওয়া তার ব্যক্তিগত পরামর্শ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রচলিত নীতিও হলো, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া গোপন পরামর্শ প্রকাশ না করা।
জানা গেছে, বৈঠকে উপস্থিত আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও কেইনের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত ছিলেন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সংঘাত আরও বিস্তারের বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। অন্যদিকে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর সর্বাধিনায়ক অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারও বোমাবর্ষণ বন্ধ করার পরামর্শ দেন। তার মতে, অভিযানটি ইতোমধ্যেই তার কার্যকারিতার সীমায় পৌঁছে গেছে।
সামরিক কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ছিল, প্রায় দুই সপ্তাহের টানা হামলায় অভিযানের শুরুতেই নির্ধারিত অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ইতোমধ্যেই আঘাতের আওতায় এসেছে।
এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইরানের উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থা, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, দ্রুতগতির হামলাকারী নৌযান এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা সামরিক স্থাপনা।
এর পাশাপাশি আরও বিস্তৃত, বহু-ধাপের একটি হামলা পরিকল্পনাও প্রস্তুত ছিল। সেই পরিকল্পনায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পরিবহন নেটওয়ার্ক, সামরিক রসদ পরিবহনে ব্যবহৃত রেলসেতু এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন-এ অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনাতেও হামলার সম্ভাবনা রাখা হয়েছিল।
উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কায় পেন্টাগন একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা, সামরিক সরঞ্জাম এবং রসদও পাঠিয়েছিল। তবে এসব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও অনেক উপদেষ্টা প্রশ্ন তোলেন, অভিযান আরও বাড়ালে ইরানের সামরিক আচরণে আদৌ কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে কি না।
নিউইয়র্ক টাইমসকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ধারাবাহিক হামলা বরং তেহরানের মনোবল ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে আরও শক্ত করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের খুব কম কর্মকর্তাই বিশ্বাস করতেন যে আরও বড় ধরনের বোমাবর্ষণ ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কি ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে?
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও, যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক হারে ব্যবহার হওয়া অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুত পুনরায় উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পেরও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সংঘাতের পুরো সময়জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ধারাবাহিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং লয়টারিং মিউনিশনের হামলা থেকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি, আঞ্চলিক মিত্র, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং কৌশলগত নৌপথ রক্ষা করতে হয়েছে। প্রতিটি হামলা প্রতিহত করতে ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে।
এই অভিযানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩, স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৩ এবং স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৬। এগুলো মিলেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তর গঠন করে।
খবরে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে একই গতিতে অভিযান চালিয়ে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা চাপে পড়বে, কারণ এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্য এলাকাতেও প্রয়োজন।
কর্মকর্তারা আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন, ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে হামলায় ব্যবহৃত নির্ভুল দূরপাল্লার অস্ত্রের (প্রিসিশন-গাইডেড স্ট্যান্ডঅফ মিউনিশন) মজুতও দ্রুত কমে আসছে।
টানা ১৩ রাত বোমাবর্ষণের পর সামরিক কমান্ডারদের মূল্যায়ন ছিল, উচ্চমূল্যের কৌশলগত অস্ত্র ব্যবহার অব্যাহত থাকলেও অভিযানের সামরিক সাফল্য ক্রমেই কমে আসছিল।
আরেকটি বড় উদ্বেগ ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা। জর্ডানে অবস্থানরত তিন মার্কিন সেনা নিহত হন, যখন ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে আঘাত হানে।
পেন্টাগনের এই উদ্বেগ নতুন নয়। চলতি বছরের শুরুর দিকেই প্রতিরক্ষা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, সংঘাত চলাকালে ইতোমধ্যে ১ হাজার ২০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মূল্য ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি। ফলে এত বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার আর্থিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন করে বড় আকারের বোমাবর্ষণ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের আরেক দফা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা ছিল।
এ ধরনের পাল্টা হামলা ঠেকাতে আরও বেশি প্যাট্রিয়ট ও অন্যান্য উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতো, যা মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের কাছে অত্যাবশ্যকীয় অস্ত্রের মজুত আরও কমিয়ে দিত।
আবার কি কূটনীতির পথে?
সামরিক অভিযানে বিরতির সময়ই ওমানের নেতৃত্বে নতুন করে মধ্যস্থতার উদ্যোগ শুরু হয়। ওমান অতীতেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সর্বশেষ উদ্যোগে কাতার ও পাকিস্তানও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
উচ্চপর্যায়ের একটি ওমানি প্রতিনিধিদল সপ্তাহান্তে তেহরান সফর করে। তাদের লক্ষ্য ছিল সংঘাত প্রশমনে একটি ‘কুলিং-অফ’ বা উত্তেজনা প্রশমনের সময় তৈরি করা।
সাম্প্রতিক সংঘাতের এই পর্যায় শুরু হয় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং জুনে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক ভেঙে পড়ার পর। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা।
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরান অবস্থান পরিবর্তন করলে সামরিক সমাধানের চেয়ে কূটনৈতিক পথই তার পছন্দ।
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিয়াং সাম্প্রতিক সামরিক পর্যালোচনার পর একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সবসময়ই বলে এসেছেন যে তিনি কূটনৈতিক সমাধান চান। তবে হরমুজ প্রণালীতে বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরান যদি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তাহলে সব বিকল্পই খোলা থাকবে।
চিয়াং আরও সতর্ক করে বলেন, সমঝোতার পথে এগোনোই ইরানের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অন্যথায় কী ঘটতে পারে, তারা তা জানে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও এখন আলোচনা চলছে, বৃহৎ আকারের আরেকটি বোমাবর্ষণের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ কি বেশি কার্যকর হতে পারে?
অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে পরিচিত কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার মনে করেন, অব্যাহত আলোচনা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমন্বয় যুদ্ধ আরও বিস্তারের চেয়ে বেশি কার্যকর ও টেকসই পথ হতে পারে।
ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টারও ধারণা, এখনই নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর চেয়ে সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই কাজ করতে পারে।
তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, আদৌ কোনো অর্থবহ আলোচনা চলছে কি না এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন নতুন কোনো সমঝোতার সুযোগ দেবে কি না, তা নিয়ে এখনও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মার্কিন বিরতিতে ইরানের প্রতিক্রিয়া
মার্কিন হামলা বন্ধ হওয়ার পর টানা দুই দিন ইরানও কোনো পাল্টা হামলা চালায়নি, যদিও তার আগের দুই সপ্তাহে প্রায় প্রতি রাতেই যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের জবাবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছিল তেহরান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ইরানের অবস্থান এখনও শর্তসাপেক্ষ। তার ভাষায়, ‘হামলার জবাবে হামলা, এটাই আমাদের নীতি। হামলা বন্ধ হলে ইরানও অভিযান বন্ধ রাখবে। এই বার্তা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হয়েছে।’
ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়াও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কৌশল যেহেতু মূলত পাল্টা জবাব দেওয়া, তাই যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধ করায় আমরাও আমাদের পাল্টা অভিযান স্থগিত করেছি।’
তবে তিনি সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে ইরানও সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেবে।
ইরানি কর্মকর্তারা বিশ্বাস করছেন না যে ওয়াশিংটনের এই বিরতি নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। রয়টার্সকে আরেক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র বলেন, তেহরানে আশাবাদের চেয়ে সংশয়ই বেশি।
তার ভাষায়, ‘হামলা বন্ধ হওয়ায় আশাবাদের চেয়ে সন্দেহই বেশি। প্রচলিত ধারণা হলো, এই বিরতি কৌশলগত, আন্তরিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণা নিয়ে ইরানের তিক্ত অভিজ্ঞতা যথেষ্ট।’
সামরিক চাপ থেকে কি অর্থনৈতিক চাপে ঝুঁকছে ওয়াশিংটন?
বিমান হামলা বন্ধ থাকলেও ইরানি বন্দরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পুরোপুরি বহাল রয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বাণিজ্য সীমিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনী এখনও বাণিজ্যিক জাহাজ থামানো, তল্লাশি এবং দিক পরিবর্তন করানোর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, নৌ অবরোধ ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা একসঙ্গে কার্যকর হলে নতুন সামরিক অভিযান ছাড়াই ধীরে ধীরে ইরানের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কমে আসবে।
তারা স্বীকার করেছেন, জুনের মাঝামাঝি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান আবারও কিছু অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করতে সক্ষম হয়েছিল, যার প্রধান ক্রেতা ছিল চীন। তবে সেই তেলের বড় অংশ এখনও গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে রয়েছে। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞার পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা দিতে সময় লাগবে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এ সপ্তাহের শুরুতে দাবি করেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রম ইতোমধ্যেই ফল দিতে শুরু করেছে। তার মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনা প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়েছে, যার ফলে ইরানের তেল আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞাও জোরদার করেছে।
শুক্রবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানি ব্যবসায়ী বাবাক জানজানির বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত নয়টি প্রতিষ্ঠান এবং চারজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। জানজানি আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন।
মাঠের বাস্তবতাও কি ট্রাম্পকে চাপে ফেলছে?
ওয়াশিংটন পোস্টের সহযোগিতায় ইপসোস পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ পরিচালনার ধরনকে সমর্থন করেছেন মাত্র ২৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।
জরিপে দেখা যায়, যুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় বাড়ছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, ওয়াশিংটন কীভাবে এই সামরিক অভিযান শেষ করতে চায়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও হোয়াইট হাউসকে আঞ্চলিক মিত্রদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
সামরিক অভিযানে এই বিরতির ঠিক আগেই ঘোষণা আসে, ২৮ জুলাই ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
তেহরানের প্রতি কোনো ধরনের কূটনৈতিক ছাড়ের বিরোধী নেতানিয়াহু সেখানে ট্রাম্পকে ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক থেকে বোঝা যেতে পারে, বর্তমান সামরিক বিরতি শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ নেবে, নাকি এটি কেবল আরেক দফা সামরিক অভিযানের আগের বিরতি।
মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করেছেন, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে থাকা উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রশাসন আরও স্বীকার করেছে, দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে, জ্বালানির দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত করতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে। এ ছাড়া সংঘাত বাড়লে অঞ্চলজুড়ে শরণার্থী সংকট তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাও কর্মকর্তারা আলোচনায় এনেছেন।
তথ্যসূত্র: ফার্সপোস্টের প্রতিবেদন অবলম্বনে।