সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুতিদের, বাড়ছে উত্তেজনা

সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুতিদের, বাড়ছে উত্তেজনা

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা শনিবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জিজান শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে। চলতি সপ্তাহে সৌদির হামলার জবাবে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরই তারা এ হামলার কথা জানায়।

এদিকে, টানা দুই সপ্তাহের মার্কিন হামলার পর শনিবার প্রথমবারের মতো ইরানে কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে উত্তেজনা এখনো প্রশমিত হয়নি।ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কারমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইরান একটি শান্তিপূর্ণ রাত কাটিয়েছে।’

জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) দুই সপ্তাহ আগে কার্যত ভেঙে পড়ে।হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকারে ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়, যার জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা শুরু করে।

এই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বন্ধ করে দেওয়া হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা এবং ৬০ দিনের জন্য সংঘাত স্থগিত রেখে আলোচনার সুযোগ তৈরি করা।তবে চলমান যুদ্ধের কারণে আলোচনা আর এগোয়নি। বর্তমানে সংঘাতের বড় অংশই আবর্তিত হচ্ছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে, যা যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের রুট ছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা আরও বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা করেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, সেতুসহ বেসামরিক অবকাঠামোকেও হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এমনকি ইরানের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলে স্থল অভিযানও চালানো হতে পারে।

শুক্রবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘একটি পথ হলো সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া, এমনকি আরও জোরালোভাবে, যাতে তাদের সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। আরেকটি, আরও বুদ্ধিমানের পথ হলো একটি চুক্তিতে পৌঁছানো।’

অন্যদিকে, ইরান উপসাগরীয় যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশের নাগরিকদের ভবিষ্যৎ হামলা থেকে নিরাপদ থাকতে ঘাঁটির কাছাকাছি না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, সংঘাত চললেও ইরানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং এটিকে তিনি ‘এ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ বলে মন্তব্য করেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ‘মার্কিন অবস্থান’ শান্তি আলোচনায় বাধা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান ‘হুমকিতে ভীত নয় এবং চাপের কাছেও নতি স্বীকার করবে না’।

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানি বন্দরে আরোপিত অবরোধ অমান্য করায় ওমান উপসাগরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে তারা গুলি চালিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা শুক্রবার একটি তেলবাহী জাহাজ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের খবর দিলেও কারা জড়িত ছিল তা জানায়নি।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শনিবার ইয়েমেন থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। হামলার লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবুর তেল শোধনাগার। পাশাপাশি ইয়েমেন সীমান্তবর্তী বন্দরনগরী জিজানের বাসিন্দাদেরও সতর্কতা জারি করেছে সৌদি সিভিল ডিফেন্স।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জিজানে আরামকোর একটি তেল শোধনাগারের ওপর কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। এএফপিকে ইয়েমেনের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানায়, শুক্রবার হোদেইদায় একটি নৌঘাঁটি এবং কামারান দ্বীপের একটি সামরিক শিবিরে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে। হুতিরা এসব হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে, গত সপ্তাহে সৌদি আরব সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। বৃহস্পতিবার তারা লোহিত সাগরে সৌদির দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। এর জবাবে ট্রাম্প তেহরান ও হুতিদের বিরুদ্ধে ‘বড় ধরনের সামরিক শাস্তির’ হুমকি দেন।

এই নৌ অবরোধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালীর বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব ইতোমধ্যে লোহিত সাগরপথে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা মে মাসের পর প্রথম। একই সঙ্গে দক্ষিণ লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী কিছু জাহাজের বিমা ব্যয়ও দ্বিগুণ হয়েছে।

শনিবার এক ইরানি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান নেই; এর শিকড় ‘পুরোনো বিরোধে’ নিহিত।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, ইয়েমেন, বাব আল-মান্দাব ও এ অঞ্চলের অন্যান্য সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান নেই’। একই সঙ্গে তিনি দুই পক্ষের মধ্যে আরও সংলাপের আহ্বান জানান।

সংঘাতের মধ্যেও আলোচনার পথ খোলা রাখতে মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে। গত দুই সপ্তাহে পাকিস্তান ও কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরাক তেহরানের কাছে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, তবে তা দ্রুত প্রত্যাখ্যান করা হয়। যদিও ইরাক এ প্রতিবেদন অস্বীকার করেছে।

এদিকে চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগের পর পাকিস্তানও নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ শুরু করার চেষ্টা করছে বলে খবর রয়েছে। একই ইস্যুতে আলোচনা করতে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি চলতি সপ্তাহে ইস্তাম্বুল সফর করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS