মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পূর্বেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভোট আয়োজনে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।এক্ষেত্রে পদ শূন্য হওয়ার পরপরই সংস্থাটি প্রক্রিয়া শুরু করবে।
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বা পদটি শূন্য হলে নির্বাচন কমিশনের ভোট আয়োজনের জন্য প্রস্তুতি রাখতেই হবে। এক্ষেত্রে পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রক্রিয়া শুরু হবে।আর নির্বাচন করতে হবে ৯০ দিনের মধ্যে।
২০২৩ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মো. সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।এরপর ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। সময়ের হিসাবে প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে এই পদে রয়েছেন তিনি। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রপতিরও অপসারণ চেয়েছিলেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও এই পদে পরিবর্তন আসেনি। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গত ৯ মে লন্ডনে যান রাষ্ট্রপতি। চিকিৎসা শেষে ১৮ মে দেশে ফিরে আসেন তিনি। লন্ডনে থাকাবস্থায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তিনি ফোনালাপ করেছেন বলে সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) তার পদত্যাগের বিষয়টি বেশ জোরেশোরেই আলোচনায় আসে।
এরই মধ্যে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হওয়ায় বিদেশে চিকিৎসাসফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার (২৪ জুলাই) দেশে ফিরছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গত ১৯ জুলাই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে যান স্পিকার। পূর্বনির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী আগামী ২৬ জুলাই তার দেশে ফেরার কথা ছিল।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্যের বিধান
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য ও এ পদে নির্বাচন সংক্রান্ত সম্ভাব্য সব বিষয়ে সংবিধানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের বিষয়ে সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এই সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যাবে। এর জন্য সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে অনুরূপ অভিযোগের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে প্রদান করতে হবে; স্পিকারের কাছে অনুরূপ নোটিশ প্রদানের দিন থেকে ১৪ দিনের পূর্বে বা ৩০ দিনের পর এই প্রস্তাব আলোচিত হতে পারবে না; এবং সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে স্পিকার অবিলম্বে সংসদ আহ্বান করবেন। এই অনুচ্ছেদের অধীন কোনো অভিযোগ তদন্তের জন্য সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত বা আখ্যায়িত কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট সংসদ রাষ্ট্রপতির আচরণ গোচর করতে পারবেন। অভিযোগ-বিবেচনাকালে রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকার এবং প্রতিনিধি-প্রেরণের অধিকার থাকবে। অভিযোগ-বিবেচনার পর মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ যথার্থ বলে ঘোষণা করে সংসদ কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করলে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
অসামর্থ্যের কারণেও রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা যাবে। সংবিধানের ৫৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতিকে তার পদ থেকে অপসারণ করা যাবে; এর জন্য সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে কথিত অসামর্থ্যের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে প্রদান করতে হবে।
সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে নোটিশ প্রাপ্তিমাত্র স্পিকার সংসদের অধিবেশন আহ্বান করবেন এবং একটি চিকিৎসা-পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব আহ্বান করবেন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তাব উত্থাপিত ও গৃহীত হওয়ার পর স্পিকার তৎক্ষণাৎ ওই নোটিশের একটি প্রতিলিপি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন এবং তার সঙ্গে এই মর্মে স্বাক্ষরযুক্ত অনুরোধ জ্ঞাপন করবেন যে, অনুরূপ অনুরোধ জ্ঞাপনের তারিখ থেকে দশ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি যেন পর্ষদের নিকট পরীক্ষিত হওয়ার জন্য উপস্থিত হন।
এই অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, অপসারণের জন্য প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে প্রদানের পর থেকে ১৪ দিনের পূর্বে বা ৩০ দিনের পর প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে না, এবং অনুরূপ মেয়াদের মধ্যে প্রস্তাবটি উত্থাপনের জন্য পুনরায় সংসদ আহ্বানের প্রয়োজন হলে স্পিকার সংসদ আহ্বান করবেন। প্রস্তাবটি বিবেচিত হওয়ার কালে রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকার এবং প্রতিনিধি-প্রেরণের অধিকার থাকবে। প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপনের পূর্বে রাষ্ট্রপতি পর্ষদের দ্বারা পরীক্ষিত হওয়ার জন্য উপস্থিত না হয়ে থাকলে প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে এবং সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে তা গৃহীত হলে প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে। আর অপসারণের জন্য প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পূর্বে রাষ্ট্রপতি পর্ষদের নিকট পরীক্ষিত হওয়ার জন্য উপস্থিত হয়ে থাকলে সংসদের কাছে পর্ষদের মতামত পেশ করার সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে না। সংসদ কর্তৃক প্রস্তাবটি ও পর্ষদের রিপোর্ট দফা অনুসারে পরীক্ষার সাত দিনের মধ্যে দাখিল করা হবে এবং অনুরূপভাবে দাখিল না করা হলে তা বিবেচনার প্রয়োজন হবে না। বিবেচিত হওয়ার পর সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হলে তা গৃহীত হওয়ার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ সংক্রান্ত বিষয়টি বলা হয়েছে সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদে। এতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কাছে পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারবেন।
এই তিন কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এ বিষয়ে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
পদ শূন্য হলে নির্বাচনের সময়
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ অবসানের কারণে নির্বাচন করতে হলে মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ৯০ দিন থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে তিনি যে সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই সংসদের মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণ হলে পদটি শূন্য হওয়ার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি—৩৫ বছরের কম বয়স্ক হন; অথবা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন; অথবা কখনো অভিশংসন দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ নিয়ে সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছরের মেয়াদে রাষ্ট্রপতি তার পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। একাদিক্রমে হোক বা না হোক—দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোনো ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকবেন না। স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদত্যাগ করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি তার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না এবং কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতিরূপে তার কার্যভার গ্রহণের দিনে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে।
নির্বাচন পদ্ধতি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে এই নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এজন্য একটি জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নির্বাচনী কর্তা সভাপতিত্ব করবেন।
সংসদের অধিবেশন চলাকালে নির্বাচনের প্রয়োজন হলে কমিশন ভোটগ্রহণের অন্যূন সাত দিন পূর্বে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের সময়সূচি নির্ধারণ করবে। আর সংসদের অধিবেশন না থাকলে ভোটগ্রহণের দিনের অন্যূন সাত দিন পূর্বে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে সংসদের বৈঠক সরকারি প্রজ্ঞাপন দ্বারা আহ্বান করবে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও একজন সংসদ সদস্যের সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর থাকতে হবে। এছাড়া যিনি মনোনীত হবেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সম্মতিসূচক তাঁরও একটি বিবৃতি থাকতে হবে। এই নির্বাচনে ভোটার হবেন সংসদ সদস্যরা। কমিশন একটি ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে।
বৈধ একাধিক প্রার্থী থাকলে এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন শেষে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদের বৈঠকে নির্ধারিত দিনে দুপুর ১২টার পর ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ যেমন প্রকাশ্যে হবে, তেমনি ভোট গণনাও প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হবে। সর্বোচ্চ ভোট যদি একাধিক প্রার্থী পেয়ে যান, তবে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করবেন। ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণাই চূড়ান্ত।