মুখ্যমন্ত্রী হয়েই কেন বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার দিতে চান শুভেন্দু?

মুখ্যমন্ত্রী হয়েই কেন বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার দিতে চান শুভেন্দু?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের সীমান্তের যে অঞ্চলে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেখানে বেড়া দেওয়ার জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেবে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির নেতৃত্বাধীন নতুন রাজ্য সরকার।

সোমবার (১১ মে) হাওড়ায় রাজ্য সচিবালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এ ঘোষণা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, এটা না করলে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা পরিবর্তন ও সুরক্ষা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের সুরক্ষার প্রশ্ন।পশ্চিমবঙ্গের সুরক্ষার প্রশ্ন এবং যেভাবে জনবিন্যাস বদলে গেছে, আজ প্রথম দিনেই আমরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর ও বিএসএফকে সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য জমি ট্রান্সফার প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিলাম। ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্যসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হলো।৪৫ দিনের মধ্যে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুই হাজার ২শ ১৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

তিনি জানান, এর মধ্যে এক হাজার ছয়শ ৫৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে পাঁচশ ৬৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া বাকি রয়েছে।

ওই ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার অনুপ্রবেশকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজ করছে।

নির্বাচনী প্রচারকালে অমিত শাহর দপ্তর থেকে এক্স হ্যান্ডেলে লেখা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত সুরক্ষিত করতে ছয়শ একর জমির প্রয়োজন, তা বিএসএফকে দিচ্ছে না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি ক্ষমতায় এলেই সেই জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই তুলছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও একই অভিযোগ তোলেন।

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এ অভিযোগের ক্ষেত্রে বলে আসছিল, সীমান্ত আমাদের বিষয় নয়, কেন্দ্র সরকারের বিষয়।

নির্বাচনের আগে রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরে বাদ গিয়েছিল প্রায় ৯১ লাখ নাম। কঙ্গনা রানাওয়াতসহ বহু বিজেপি সংসদ সদস্য দাবি করেছিলেন, এই বাদ যাওয়া সবাই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী।

এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের মহোৎসব হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিকদলকে কৃতজ্ঞতা জানান মুখ্যমন্ত্রী। এ ছাড়াও আজকের বৈঠকে আলোচিত বিষয়ের ওপর মোট ছয়টি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তিনি।

এর মধ্যে আছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য প্রায় ছয়শ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।

যে সিদ্ধান্তগুলো পশ্চিমবঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভা নিয়েছে, সেগুলো:

প্রথম, শুভেন্দু অধিকারী বলেন, নির্বাচনের আগে বহু বিজেপি কর্মী খুন হয়েছেন। তাদের পরিবারের দায়িত্বভার নিয়েছে সরকার।

দ্বিতীয়, পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস ‘বদলে যাওয়া’ আটকাতে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করা হলো। ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর করা হবে।

তৃতীয়, মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গও আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে যুক্ত হলো। একইসঙ্গে উজ্জ্বলা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, বিশ্বকর্মা যোজনাসহ কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে চালু করা হলো বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

চতুর্থ, পশ্চিমবঙ্গের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া অফিসারদের কেন্দ্রীয় সরকারের ট্রেনিংয়ে যুক্ত করা হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

পঞ্চম, মি. অধিকারী ঘোষণা করেন, ভারতের নতুন আইন ‘ভারত ন্যায় সংহিতা’ পশ্চিমবঙ্গে চালু করা হলো।

তিনি অভিযোগ তোলেন, এই আইন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে পুরোনো আইনানুযায়ী কাজ চালানো হচ্ছিল।

ষষ্ঠ, রাজ্য সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের বয়সসীমা ছাড় দেওয়া হলো।

তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৫ সাল থেকে রাজ্য সরকারি চাকরিতে নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে, এজন্য আবেদনকারীদের অতিরিক্ত সময় দেওয়া হলো।

ওই ছয়টি ঘোষণার পর সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগও করেন নয়া মুখ্যমন্ত্রী। এমনকি জনগণনা সংক্রান্ত কাজ আটকে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

আজ থেকে পশ্চিমবঙ্গে জনগণনার কাজ শুরু করার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বর্ধিত হারে ডিএ নিয়ে তিনি বলেন, এই সংক্রান্ত আলোচনা পরবর্তী বৈঠকে হবে।

তিনি বলেন, নতুন সরকার তথ্য নিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দেবে। সরকারি তথ্য ছাড়া কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে না।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সাবেক সরকার ‘ফর দ্য পার্টি, বাই দ্য পার্টি’ হিসেবে কাজ করত।

তিনি বলেন, সংবিধান প্রণেতা ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরের ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল আদর্শকে তুলে ধরা হবে।

ওই ছয়টি সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রধান বিরোধীদল তৃণমূল কংগ্রেস থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এর আগে ৯ মে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও আরও পাঁচ মন্ত্রী।

জানা যাচ্ছে, মন্ত্রিসভার আরও অনেকে ধীরে ধীরে শপথ নিয়ে যুক্ত হবেন।

নবান্ন ভবনের সভাকক্ষে বৈঠকের আগে বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করে পরে পার্টি অফিসে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখান থেকে নবান্নে যান তিনি। পার্টি অফিস থেকে বের হওয়ার সময় কর্মীরা তাকে শঙ্খ বাজিয়ে সম্মান জানান।

বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের বলেন, সরকার ও পার্টি আলাদা দুটি সত্তা, দুটির সমন্বয় থাকবে। যে সরকার তৈরি হয়েছে সেটি বিজেপি সরকার নয়, পশ্চিমবঙ্গ সরকার হবে।

নবম মুখ্যমন্ত্রী নবান্নে ঢোকার আগে তাকে গার্ড অব অনার দিয়ে অভিবাদন জানায় কলকাতা পুলিশ। উপস্থিত ছিলেন রাজ্য পুলিশের ডিজি ও কলকাতা এবং হাওড়ার দুই পুলিশ কমিশনার।

নবান্ন ভবনের ১৪ তলায়, যেখানে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস ছিল, সেই ফ্লোরেই প্রথম বৈঠক কররেন শুভেন্দু।

বৈঠকে দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, ক্ষুদিরাম টুডু ও অশোক কীর্তনিয়া ছিলেন।

ওই বৈঠক থেকে বেরিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, গোটা রাজ্যবাসীকে জানাচ্ছি, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর আদর্শ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ডবল ইঞ্জিন সরকারের মাধ্যমে মানুষের জন্য কাজ করা হবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনো চালু থাকা সামাজিক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না বলেও জানান পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS