ট্রাম্প অবশেষে বুঝতে পেরেছেন, ইসরায়েল তাকে ব্যবহার করেছে

ট্রাম্প অবশেষে বুঝতে পেরেছেন, ইসরায়েল তাকে ব্যবহার করেছে

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে তৈরি হওয়া প্রকাশ্য বিবাদ একটি পরিচিত অভিযোগ সামনে এনেছে। অভিযোগটি হলো– তারা দুজনেই এখন ‘মিশন ক্রিপ’ বা লক্ষ্যচ্যুত অভিযানে জড়িয়ে পড়েছেন।

এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত এই শব্দগুচ্ছটি খুব একটা শোনা না গেলেও গত ৭৫ বছরের অধিকাংশ যুদ্ধের আলোচনায় এটি একটি অতি ব্যবহৃত প্রবাদ। সুয়েজ খাল সংকট ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে এই শতাব্দীর ইরাক ও আফগানিস্তানে দশকব্যাপী আন্তর্জাতিক অভিযানগুলোতেও এই শব্দটির প্রয়োগ দেখা গেছে।

‘মিশন ক্রিপ’ বলতে এমন একটি সামরিক অভিযানকে বোঝায়, যা তার মূল উদ্দেশ্য এবং পরিধির বাইরে চলে যায়। এর ফলে অভিযানের প্রাথমিক হুকুম বা ম্যান্ডেট এবং বাজেট– উভয়ই লঙ্ঘিত হয়।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন চরম ক্ষুব্ধ। তার এই রাগের কারণ হলো– নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি ও বাসিজ মিলিশিয়ার কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানিকে হত্যার পর ইরানজুড়ে একটি গণঅভ্যুত্থানের ডাক দেন নেতানিয়াহু।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুর দিকে ট্রাম্প নিজে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) কথা বললেও এখন তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করছেন। নেতানিয়াহু আমেরিকাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তারা সব ইরানিতে রাজপথে নেমে বর্তমান সরকারকে উৎখাত করতে উৎসাহিত করে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার মুখে। তবে একটি ফোন কলে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেছেন, ‘আমরা কেন মানুষকে রাজপথে নামতে বলব, যখন তারা সেখানে শুধু গুলিতে প্রাণ হারাবে?’

তারা আপাতত অপেক্ষা করতে রাজি হয়েছেন যে ইরানিরা তাদের বার্ষিক আগুনের উৎসব ‘চাহারশানবে সুরি’-কে গণবিক্ষোভের জন্য ব্যবহার করে কি না।নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ‘আমাদের বিমানগুলো ময়দানে, মোড়ে মোড়ে এবং শহরের চত্বরে থাকা সন্ত্রাসীদের ওপর আঘাত হানছে। এর উদ্দেশ্য হলো ইরানের সাহসী মানুষরা যেন নিশ্চিন্তে আগুনের উৎসব পালন করতে পারে।’

ট্রাম্পের কাছে এটিই হলো ‘মিশন ক্রিপ’। হোয়াইট হাউজ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব মূল যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ছিল না– যদিও জেরুজালেম সরকারের কাছে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনই প্রধান লক্ষ্য। এ সপ্তাহে ট্রাম্প কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের বলেছেন যে, তার লক্ষ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল বাহিনী, পারমাণবিক সক্ষমতা, নৌবাহিনী এবং সন্ত্রাসী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সহায়তা ধ্বংস করা।গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ নিয়ে কোনো কথা বলেননি।

ট্রাম্প এই সপ্তাহান্তেই যুদ্ধ শেষ করার জন্য কোনো চুক্তিতে যেতে পারেন– এমন ভয়ে নেতানিয়াহু তার জেনারেলদের আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ‘সর্বাত্মক আক্রমণ’ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পারস্য উপসাগর থেকে তেল-গ্যাস রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পের বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। যার ফলে তার ইরান ‘অভিযান’ দ্রুত শেষ হতে পারে। তিনিও এখন লক্ষ্যচ্যুতির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রাম্প উপসাগরীয় অঞ্চলে দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি গ্রুপ এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্যারাট্রুপারদের একটি যুদ্ধদল পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন– যেখানে সৈন্য সংখ্যা ১০,০০০-এর বেশি। পেন্টাগন থেকে ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পদাতিক বাহিনী উত্তর উপসাগরের খার্গ দ্বীপের প্রধান তেল টার্মিনাল এবং হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার কাছে অবস্থিত লারাক দ্বীপ দখল করতে পারে।

কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি ছাড়া কমান্ডো ও প্যারাট্রুপারদের নামানো এবং জোর করে হরমুজ প্রণালীতে পথ তৈরির চেষ্টা করা একটি বিশাল ঝুঁকি। পদাতিক বাহিনীর অভিযান মূল পরিকল্পনায় ছিল না, যা আসলে শুরু থেকেই অস্পষ্ট ছিল। এমনকি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’ (THADD)-এর প্রয়োজনীয়তাও আগে ভাবা হয়নি। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা জোরদার করতে এগুলো এখন তড়িঘড়ি করে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সরিয়ে আনতে হয়েছে।

‘মিশন ক্রিপ’ মানেই বিপদ। একবার কোনো উত্তপ্ত এলাকায় বাহিনী মোতায়েন করা হলে নতুন হুমকি মোকাবিলায় পরিকল্পনা বারবার পরিবর্তন ও বাড়াতে হয়। কিন্তু অভিযানের এই বিশাল বিস্তার–যেমন ২০০৩ সালে ইরাকে এবং ২০০১ সালে আফগানিস্তানে ব্রিটেনের ভূমিকা–জবাবদিহিতার মুখে পড়েছিল। ১০ বছরে ব্রিটেন হেলমান্দে তাদের সৈন্য সংখ্যা ৩,০০০ থেকে বাড়িয়ে একপর্যায়ে প্রায় ২০,০০০-এ নিয়ে গিয়েছিল।

আমরা এখন ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো তাদের প্রক্সিগুলোর বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামরিক প্রচেষ্টায় একই ধরনের বিস্তার লক্ষ্য করছি। ইসরায়েলি ও আমেরিকানরা ‘এসকেলেশন ম্যানেজমেন্ট’ বা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। এটি একটি নড়বড়ে ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি যে, দ্রুত যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার জন্য আপনাকে উত্তেজনা আরও বাড়াতে হবে এবং শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে।

তবে খুব কম ইসরায়েলি ইরানের সঙ্গে এ যুদ্ধের দ্রুত সমাধান আশা করেন। এখানে কৌশলগত আরেকটি শব্দ সামনে আসে। অনেক বাস্তববাদী ইসরায়েলি কমান্ডার ও পরিকল্পনাকারী ‘ঘাস কাটা’ (mowing the grass) কৌশলের ওপর নির্ভর করছেন। এর অর্থ হলো– হামাস, হিজবুল্লাহ, আইআরজিসি এমনকি ইরান রাষ্ট্রের মতো শত্রুদের পরাজিত করতে আপনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধারাবাহিকভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। ২০১৮ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলি কমান্ডারদের কাছে এটি একটি স্বীকৃত মতবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা অনেকটা ঘাস কাটার মতো–একটি চক্র, যা বারবার করতে হবে। কারণ, হামাস নতুন নতুন যোদ্ধা তৈরি করে।

একটি নীরব স্বীকৃতি এখানে রয়েছে যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা ও তাদের নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক ধ্বংস হওয়া থেকে এখনো অনেক দূরে। হেলমান্দে তালেবান বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করা জন লরিমার এবং মার্ক কার্লটন-স্মিথের মতো দূরদর্শী ব্রিটিশ কমান্ডাররা বুঝতে পেরেছিলেন যে, তারাও আসলে একটি ‘ঘাস কাটা’ অভিযানে যুক্ত ছিলেন— এবং তালেবান একটি দীর্ঘস্থায়ী ও শেকড় গেঁড়ে থাকা সংস্কৃতি।

সামরিক আলোচনার আরও দুটি শব্দ এখন আবার ফিরে আসা উচিত— একটি হলো ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ (বের হওয়ার কৌশল) এবং অন্যটি ‘অপারেশনাল অ্যান্ড স্টেট’ (অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায়)। বর্তমানে আমরা ‘অফ র‍্যাম্প’ সমাধানের কথা শুনছি, যা ইরান বা হরমুজ প্রণালীর মতো কঠিন সংকট থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার একটি সাময়িক বুলি। অথচ ট্রাম্পের এই অভিযানের জন্য একটি পরিষ্কার লক্ষ্য এবং সেখান থেকে সসম্মানে ঘরে ফেরার সঠিক কৌশল থাকা উচিত ছিল। পিট হেগসেথের পেন্টাগনের ভিডিও গেমের মতো চিন্তাভাবনায় সম্ভবত এমন কিছুর অস্তিত্ব নেই।

তাই এখন সামরিক জগতের গতানুগতিক একটি প্রবাদ সামনে আসছে– ‘ব্যর্থতাকে কখনো শক্তিশালী করো না’। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের এই কুয়াশার মধ্যে আমার ভয় হচ্ছে– ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ এবং ‘এপিক ফিউরি’র বাহিনীগুলো ঠিক সেই ভুলটিই করতে যাচ্ছে; তারা তাদের অভিযানের পরিধি বাড়াচ্ছে এবং একটি ব্যর্থতাকে টিকিয়ে রাখতে আরও শক্তি অপচয় করছে।

দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে অনুদিত

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS