স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে আজো কেন বিভ্রান্তি?

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে আজো কেন বিভ্রান্তি?

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও ‘ঘোষণা’ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা অব্যহত রয়েছে বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ দেশের বিশিষ্টজনেরা। তারা বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভিন্ন আবহে মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হচ্ছে। কিন্তু এখনও বেশকিছু গণমাধ্যমের তথ্য জন্ম দিচ্ছে বিতর্কের, ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কবে কখন প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এ নিয়ে কয়েকটি দৈনিকের দেওয়া তথ্য যেন সুকৌশলে প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করছে।এবোরের স্বাধীনতা দিবসে প্রথম আলোয় ‘২৫ মার্চের গণহত্যা, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনা’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন স্টেশন থেকে প্রথমবার নিজ নামে এবং কিছুক্ষণ পর ‘সংশোধন’ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান।

দৈনিক সমকালের তথ্যও প্রায় একই। পত্রিকাটিতে ‘দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে স্বাধীনতার যুদ্ধ’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ৮ ইবির মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া তার প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করলেও পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরমর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন।

কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অধিকাংশ বক্তব্য এবং লেখা বলছে ভিন্ন কথা।

জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ মার্চেই দিয়েছিলেন। এর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহ’র (বীর উত্তম) গ্রন্থে। তিনি [Bangladesh at War, Academic Publishers, Dhaka, 1989] বইয়ের ৪৪-৪৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘মেজর জিয়া ২৫ মার্চের রাত্রিতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সদলবলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।তার কমান্ডিং অফিসার জানজুয়া ও অন্যদের প্রথমে গ্রেফতার এবং পরে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মোকাবিলার জন্য সবাইকে আহ্বান জানান। এতে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ মেজর জিয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আরেকটি ঘোষণায় বলেন, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সামরিক সর্বাধিনায়করূপে আমি মেজর জিয়া শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’

জিয়া ২৬শে মার্চ রেডিওতে তার প্রথম ঘোষণা দেন।এই ঘোষণায় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলার পাশাপাশি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও ঘোষণা করেন।

মেজর কে এম শফিউল্লাহ ১৯৮৯ সালে তার রচিত, Bangladesh at War গ্রন্থে আরো লিখেন, ‌‘Having settled his score with his commanding officer on the night of March 25, Zia decided to take his battalion on the outskirts of the city to re-organise, strengthen and then launch a decisive blow on Chittagong. All troops were collected at a place near Patiya. (২৫ মার্চ রাতে কমান্ডিং অফিসারের সাথে হিসাব চুকিয়ে নিয়ে, জিয়া তার ব্যাটালিয়নকে শহরের উপকণ্ঠে নিয়ে গিয়ে পুনর্গঠন, শক্তিশালীকরণ এবং তারপর চট্টগ্রামের ওপর একটি চূড়ান্ত আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেন। সমস্ত সৈন্যকে পটিয়ার কাছে একটি জায়গায় জড়ো করা হয়েছিল।)

…All the troops then took an oath of allegiance to Bangladesh. The oath was administered by Zia at 1600 hrs. on March 26. Thereafter, he distributed 350 soldiers of East Bengal Regiment and about 200 troops of East Pakistan Rifles to various task forces under command of an officer each. These task forces were meant for the city. The whole city of Chittagong was divided into various sectors and each sector was given to a task force. After having made these arrangements, Zia made his first announcement on the radio on March 26. In this announcement apart from saying that they were fighting against Pakistan army, he also declared himself as the head of state. This, of course, could have been the result of tension and confusion of the moment. As the battalion began to gather strength, in the afternoon of March 27, Zia made another announcement from the Shwadhin Bangla Betar Kendra established at Kalurghat. (এরপর সৈন্যরা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। ২৬শে মার্চ বিকেল ৪টায় জিয়া এই শপথবাক্য পাঠ করান। অতঃপর তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩৫০ জন সৈন্য এবং ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের প্রায় ২০০ জন সৈন্যকে একজন করে অফিসারের অধীনে বিভিন্ন টাস্ক ফোর্সে বণ্টন করে দেন। এই টাস্ক ফোর্সগুলো শহরের জন্য গঠিত হয়েছিল। পুরো চট্টগ্রাম শহরকে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি সেক্টরকে একটি করে টাস্ক ফোর্সের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করার পর, জিয়া ২৬শে মার্চ রেডিওতে তার প্রথম ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলার পাশাপাশি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও ঘোষণা করেন। এটি অবশ্যই সেই মুহূর্তের উত্তেজনা ও বিভ্রান্তির ফল হতে পারত। ব্যাটালিয়নটি যখন শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করে, তখন ২৭শে মার্চ বিকেলে জিয়া কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আরেকটি ঘোষণা দেন।)

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সুখান্ত সিং তার বই ‘ইন্ডিয়াস ওয়ারস সিন্স ইন্ডিপেনডেন্স: দ্য লিবারেশন অব বাংলাদেশ’-এ লিখেছেন, ‘২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারে বাঙালি অফিসার মেজর জিয়ার কণ্ঠস্বর ইতিমধ্যে গর্জে উঠেছিল।’

The announcement reads as follows:
a. I, Major Zia, provisional commander-in-chief of the Bangladesh liberation army, hereby proclaim, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh.
b. I, also declare, we have alreadz formed a sovereign, legal government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution.
c. The new democratic government is committed to a policy of non- alignment in international relations. It will seek
friendship with all nations and strive for international peace.
d. I appeal to all governments to mobilize public opinion in their respective countries against the brutal genocide in Bangladesh.
[He further said, «We shall not die like cats and dogs but shall die as worthy citizens of Bangla Ma. Personnel of the East Bengal Regiment, the East Pakistan Rifles and the entire police force had surrounded West Pakistani troops in Chittagong, Comilla, Sylhet, Jessore, Barisal and Khulna. Heavy fighting was continuing.’] (ঘোষণাপত্রটি নিম্নরূপ:
ক. আমি, মেজর জিয়া, বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক, এতদ্বারা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।

খ. আমি আরও ঘোষণা করছি যে, আমরা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি সার্বভৌম, আইনসম্মত সরকার গঠন করেছি, যা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

গ. নতুন গণতান্ত্রিক সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জোটনিরপেক্ষতার নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটি সকল জাতির সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে এবং আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য সংগ্রাম করবে।

ঘ. আমি সকল সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন বাংলাদেশে সংঘটিত এই নৃশংস গণহত্যার বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশে জনমত সংগঠিত করে।

[তিনি আরও বলেন, আমরা বিড়াল-কুকুরের মতো মরব না, বরং বাংলার যোগ্য নাগরিক হিসেবে মৃত্যুবরণ করব।] 

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘স্বাধীনতার ডাক এসেছিল শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হবার পরে, তার আগে নয়। আমার জানা মতে তিনি কোনো সময় স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।

এখানেই শেষ নয়, ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ বিষয়ক ইতিহাস প্রকাশিত হয়েছে ‘ভারত রক্ষক› নামের সাইটে। সেখানে ৯৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়া ২৬ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তিনি বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের (Temporary Head of Republic) দায়িত্বও গ্রহণ করেন।

এছাড়া ভারতীয় সাংবাদিক জ্যোতি সেন গুপ্ত তার বই ‘হিস্ট্রি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ’-এ লিখেছেন, ‘মেজর জিয়া ও তার বাহিনী ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বিদ্রোহ করে এবং ওইদিন সন্ধ্যায় তার নিজের নামে রেডিওতে প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।’

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সুখান্ত সিং তার বই ‘ইন্ডিয়াস ওয়ারস সিন্স ইন্ডিপেনডেন্স: দ্য লিবারেশন অব বাংলাদেশ’-এ লিখেছেন, ‘২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারে বাঙালি অফিসার মেজর জিয়ার কণ্ঠস্বর ইতিমধ্যে গর্জে উঠেছিল।’

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস সচিবালয় ১৯৭১-এ বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনাবলি নিয়ে একটি আইনি দলিল তৈরি করে। এটি ১৯৭২ সালের জুনে প্রকাশিত হয়। এতে ‘দ্য ক্র্যাকডাউন ইন ঢাকা’ শীর্ষক অংশে ১৯৭১ সালের ২৫ ও ২৬ মার্চের হত্যাযজ্ঞের বর্ণনার পাশাপাশি শেষের দিকে বলা হয়, ‘২৬ মার্চ বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির রেডিওতে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা (মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণায় বলেন, আমি বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক মেজর জিয়া এতদ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি) করা হয় এবং প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হয়। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমান রাত ১টা ৩০ মিনিটে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের বাসাতেই অবস্থান করছিলেন। তাকে ছাড়াই আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা পালিয়ে ভারতে গিয়ে কলকাতায় অস্থায়ী সরকার গঠন করেন।

রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ্ বলেন, জিয়াউর রহমান প্রথম ঘোষণাটি নিজের নামে দিয়েছিলেন ২৬ মার্চ, পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে ২৭ ও ২৮ তারিখে আবার ঘোষণাটি দেন।

প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ করা যায়, লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার ২৯ মার্চ সংখ্যায় লেখা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল শহর চট্টগ্রামে মেজর জিয়া খান (হবে মেজর জিয়াউর রহমান) নিজকে বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির প্রধান ঘোষণা দিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। (International press coverage on Bangladesh Liberation War)

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘স্বাধীনতার ডাক এসেছিল শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হবার পরে, তার আগে নয়। আমার জানা মতে তিনি কোনো সময় স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। (The cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as I know, has not asked for independence even now. (Bangladesh Documents, vol-11)

অন্যদিকে ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ জাতির উদ্দেশে একটি বক্তব্য দেন, যেটি প্রচারিত হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখানে তাজউদ্দিন আহমদ বলেন, The brilliant success of our fighting forces and the daily additions to their strength in manpower and captured weapons has enabled the Government of the Peoples Republic of Bangladesh, first announced through Major Ziaur Rahman, to set up a fullfedged operational base from which it is administering the liberated areas.” [Bangladesh Documents, vol-I, Indian Government, Page 284] .

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ্ বলেন, জিয়াউর রহমান প্রথম ঘোষণাটি নিজের নামে দিয়েছিলেন ২৬ মার্চ, পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে ২৭ ও ২৮ তারিখে আবার ঘোষণাটি দেন। এ নিয়ে বির্তকের কোনো অবকাশ নেই। কারণ ২৬ তারিখে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার বিষয়টি এমন ব্যক্তিরা তাদের বিভিন্ন বক্তব্য ও গ্রন্থে উল্লেখ করে গেছেন যারা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এমপি-মন্ত্রীও হয়েছিলেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজের লেখায়ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের তিন মাস পরই তিনি ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দৈনিক বাংলা পত্রিকার ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় তা প্রথম প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ তারিখে সাপ্তাহিক পত্রিকা বিচিত্রায় লেখাটি পুনরায় ছাপা হয়। 

অন্যদিকে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, যারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষকের বদলে পাঠক হিসেবে দেখাতে চায়, তারাই ২৭ তারিখের ঘোষণাটিকে সামনে আনতে চায়। কারণ সেখানে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথাটি রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ঘোষণাটি তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নিজ উদ্যোগে লেখা এবং পাঠ করা। মেজর জিয়া ২৫ তারিখ অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হওয়ার পরই ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। একজন তরুণ মেজর হিসেবে ভবিষ্যৎ বিপদের আশংকাকে তুচ্ছ করে, নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে দেশ মাতৃকার স্বার্থে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ২৫ মার্চ যখন জাতি দ্বিধাগ্রস্ত কিংকর্তব্য বিমূঢ় অবস্থায় ছিলো তখন জিয়াউর রহমানের সেই ঘোষণা তাদের ঐক্যবদ্ধ করে প্রতিরোধ যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং ২৬ মার্চের ঘোষণাকে বাদ দেওয়া মানে জিয়াউর রহমানের অবদান এবং তাৎপর্যকে খাটো করার অপচেষ্টা।  

উল্লিখিত তথ্য উপাত্ত থেকে এটা স্পষ্ট যে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম প্রহরেই মেজর জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথাটি যুক্ত করে ২৭ এবং ২৮ মার্চ আবারো ঘোষণা দেন। ২৬, ২৭ এবং ২৮ মার্চের এই ঘোষণাগুলো কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার প্রচারিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ডে জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাটি বর্ণিত হয়েছে।

মেজর জিয়ার স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটি ছিল এই:
Dear fellow freedom fighters,
I, Major Ziaur Rahman, Provisional President and Commander-in- Chief of Liberation Army do hereby proclaim independence of Bangladesh and appeal for joining our liberation struggle. Bangladesh is independent. We have waged war for the libreation of Banglsdesh. Everybody is requested to participate in the liberation war with whatever we have. We will have to fight and liberate the country from the occupation of Pakistan Army.
Inshallah. victory is ours. (প্রিয় সহযোদ্ধাগণ, আমি, মেজর জিয়াউর রহমান, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং মুক্তি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, এতদ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং আমাদের মুক্তি সংগ্রামে যোগদানের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশ স্বাধীন। আমরা বাংলাদেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছি। আপনাদের সকলের কাছে অনুরোধ, যার যা কিছু আছে তা দিয়েই এই মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করুন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলদারিত্ব থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। ইনশাআল্লাহ, বিজয় আমাদেরই।)

zia

ইতিহাসের তথ্য উপাত্ত থেকে আরও জানা যায়, ২৫ মার্চ রাতে জানজুয়াকে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেন মেজর জিয়া। মধ্যরাতের পর জানজুয়াসহ অন্যান্য বন্দিদের হত্যা করা হয়। এরপর ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ড গ্রহণ করেন তিনি। তারপর একটি ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজ সৈনিকদের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেন। 

যেখানে ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি ধরে রাখতে চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় দুই একর জায়গার ওপর ১৯৭৯ সালে ‘বিপ্লব উদ্যান’ গড়ে তোলা হয়। এখান থেকেই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজের লেখায়ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের তিন মাস পরই তিনি ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দৈনিক বাংলা পত্রিকার ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় তা প্রথম প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ তারিখে সাপ্তাহিক পত্রিকা বিচিত্রায় লেখাটি পুনরায় ছাপা হয়। 

প্রবন্ধের শেষের অংশে তিনি লেখেন, “সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটেলিয়নের অফিসার, জেসিও, আর জওয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানতো। আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে এ আদেশ মেনে নিলো। আমি তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দিলাম। তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্ত অক্ষরে বাঙালীর হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনোদিন ভুলবে না। কো-নো-দি-ন না।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, সময়ের পরিক্রমায় ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। মনগড়া ইতিহাস, ইতিহাস বিকৃতির বদলে প্রয়োজন নির্মোহ বিশ্লেষণ। আর তা যাচাই করতে হবে সত্যের কষ্ঠিপাথরে অকাট্য দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে। কারো প্রতি অতিমাত্রায় স্তুতি কিংবা নিন্দা নয়, ইতিহাসের বাঁক বদলে ব্যক্তির ভূমিকা এবং অবদানই  নির্ধারণ করবে তার অবস্থান।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS