জেলবন্দি ‘অধিনায়ক’ ইমরান খানের পুনরুত্থান:
পাকিস্তান রাষ্ট্রের ৭৯ বছরের ইতিহাসে অনেক নেতা এসেছেন, অনেকে চলেও গেছেন। কিন্তু জনপ্রিয়তার দাঁড়িপাল্লায় মাপলে ‘ইমরান খান’ নামটির ধারেকাছে কেউ নেই। তিনি কেবল একজন মানুষ নন, বরং কয়েক প্রজন্মের আবেগ।
ক্রিকেট কিংবদন্তি থেকে সমাজসেবী, তারপর দাপুটে রাজনৈতিক নেতা এবং বর্তমানে আদিয়ালা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের এক নিঃসঙ্গ বন্দি; ইমরানের জীবনের প্রতিটি বাঁক যেন এক একটি মহাকাব্য।তবে বর্তমানে পাকিস্তান রাষ্ট্র তাকে জনমানস থেকে মুছে ফেলার এক অদ্ভুত ও কঠিন লড়াইয়ে নেমেছে।
২০২৩ সালের মে মাসে গ্রেপ্তারের পর থেকে ইমরান খানকে দৃশ্যপটে রাখা এক প্রকার নিষিদ্ধ। টিভি চ্যানেলে তার নাম নেওয়া বারণ, সংবাদপত্রে তার ছবি প্রকাশে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। এমনকি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) যখন ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের ভিডিও প্রকাশ করে, সেখান থেকেও ইমরানকে ছেঁটে ফেলার চেষ্টা করা হয়।কিন্তু ডিজিটাল যুগে এই ‘সেন্সরশিপ’ হিতে বিপরীত হয়েছে।
কারাগারে তাকে ‘৮০৪’ নম্বর কয়েদি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে এই সংখ্যাটিই এখন পাকিস্তানের প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। রিকশার নম্বর প্লেট থেকে শুরু করে বার্মিংহামের বিরিয়ানি শপ; সবখানে এখন ‘৮০৪’-এর জয়জয়কার।
স্টেডিয়ামে স্লোগান উঠছে, ‘তেরা ইয়ার, মেরা ইয়ার, কয়েদি নম্বর ৮০৪!’ রাষ্ট্র তাকে যতোই আড়াল করতে চাইছে, তিনি ততোই সর্বব্যাপী হয়ে উঠছেন।
রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের একটি নির্জন ব্লকে ইমরানকে রাখা হয়েছে। তার পাশের সাতটি সেলই খালি। সেখানে সঙ্গী বলতে কেবল এক আলমারি বই; নেলসন ম্যান্ডেলার ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ থেকে শুরু করে রুমি ও কিসিঞ্জারের রচনাবলী।
তথ্যমতে, জেলখানায় তিনি নিজেকে একজন অ্যাথলেটের মতো গড়ে তুলছেন।প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করেন, যার জন্য আদালত থেকে ১২ কেজির ডাম্বেল ও একটি এক্সারসাইজ বাইক বরাদ্দ নিয়েছেন।
তার বড় ছেলে সুলাইমান ও ছোট ছেলে কাসিমের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ বিরতির পর বাবার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি কোনো অভিযোগ করেন না। উল্টো জীবনের গভীর দর্শনের পাঠ দেন।
কাসিম জানান, তার বাবা এখন ধ্যানের মাধ্যমে এক প্রকার উচ্চতর আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছে গেছেন, যেখানে কারাগারের নিষ্ঠুরতা তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। তবে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে।
রাষ্ট্র যখন টিভি-পত্রিকা থেকে ইমরানকে মুছে দিচ্ছে, তখন তার দল ‘পিটিআই’ ব্যবহার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই; ইমরানকে না দেখিয়েই তার কণ্ঠের অবিকল অনুকরণে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভার্চুয়াল র্যালি করা হচ্ছে।
টিকটকে তার প্রথম ভিডিওটি ৩৬৭ মিলিয়নের বেশি মানুষ দেখেছেন। ৫ মে ২০২৪-এর নির্বাচনের সময় ইমরান জেলে থাকলেও তার প্রার্থীরাই সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করেন। এটিই প্রমাণ করে যে, সশরীরে উপস্থিত না থেকেও তিনি পাকিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
ইমরানের বয়স এখন ৭৩। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে লিয়াকত আলী খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো কিংবা বেনজির ভুট্টোর মতো জনপ্রিয় নেতাদের পরিণতি হয়েছে মর্মান্তিক। সেই ইতিহাসের কালো ছায়া কি ইমরানের ওপরও পড়বে? এমন আশঙ্কা ভক্তদের মনে থাকলেও ইমরান নিজে যেন অকুতোভয়। পিটিআই-এর মধ্যে কোন্দল বা উত্তরসূরি নির্বাচনের জটিলতা থাকলেও সমর্থকরা মনে করেন, ইমরানের আদর্শই দলের প্রাণ।
রাষ্ট্রের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী তাকে ‘নার্সিসিস্ট’ বা ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ বলে আখ্যা দিলেও সাধারণ মানুষের কাছে তিনি একজন ‘মুর্শিদ’ বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছেন।
শেষ পর্যন্ত হয়তো রাষ্ট্র পর্দা টেনে ইমরানকে আড়াল করতে পারবে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয় থেকে তাকে মুছে ফেলা অসম্ভব। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়— ‘ইমরানকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা আর আকাশকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা একই কথা।’
– ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত ও ঈষৎ সংক্ষেপিত।