ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে টানা তৃতীয় দিনের মতো রাজধানী ছাড়ছে ঘরমুখো মানুষ। তবে যাত্রীচাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিডিউল বিপর্যয়, ফলে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ভিড়, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগ। অনেক যাত্রীকে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত পন্টুনে দাঁড়িয়ে লঞ্চের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, পন্টুনজুড়ে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি।পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই আগেভাগে ঘাটে এসে অবস্থান নিলেও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে টিকিট সংগ্রহ ও লঞ্চে ওঠা—দুই ক্ষেত্রেই চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা।
বিশেষ করে ভোলা, হাতিয়া, হিজলা, শৌলা, বেতুয়া ও পটুয়াখালী রুটে লঞ্চ সংকট বেশি দেখা গেছে। যেসব লঞ্চ ঘাটে এসেছে, সেগুলো পূর্ণ যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ছাদেও যাত্রী বহনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে নির্ধারিত সময়ের কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই জানেন না তাদের লঞ্চ কখন ছাড়বে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লঞ্চ ভরে গেলেই তা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।এদিকে ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সদরঘাট ও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
লক্ষ্মীবাজার, ধোলাইখাল, বংশাল, গুলিস্তানসহ আশপাশের সড়কে দীর্ঘ যানজটে আটকে থেকে অনেক যাত্রীকে শেষ পর্যন্ত পায়ে হেঁটে ঘাটে পৌঁছাতে দেখা গেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও লঞ্চের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
নাজিরপুর যাবেন মো . আকাশ বলেন, দুপুর ২ টা থেকে বসে আছি। এখন ৭ টা বাজে কোনো লঞ্চ নেই।শুনেছি মুন্সিগঞ্জের কাছে লঞ্চ আছে, সেটা আসলে আবার এ লাইনে লঞ্চ দেয়া হবে।
গঙ্গাপুর যাবে মো. কামাল হোসেন বলেন, ঘাটে এসে দেখি লঞ্চ নেই। বলেছে লঞ্চ আসলে তারপর যেতে পারবো। ঘন্টাখানেক হলো পরিবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
মেহেন্দীগঞ্জ যাবেন মো. রুবেল বলেন, এক ঘণ্টা হয়েছে ঘাটে আসছি। লঞ্চ নেই। শুনেছি একটি লঞ্চ আসতেছে সেটা আবার রাত ১০ টার দিকে যাবে। সে লঞ্চেই যাবো।
অন্যদিকে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত যাত্রীচাপ ও আগের দিনের দুর্ঘটনার পর সতর্কতার কারণে নির্দিষ্ট সময়সূচি রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লঞ্চ ভরে গেলেই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নৌপথে ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত লঞ্চ সংযোজন, নিরাপত্তা জোরদার এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।সাধারণ সময়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি লঞ্চ চলাচল করলেও বর্তমানে ফিটনেসপ্রাপ্ত ৭৪ টি লঞ্চসহ অতিরিক্ত লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিশেষ করে বরিশাল রুটে স্বাভাবিকভাবে ১৬টি লঞ্চ চলাচল করলেও ঈদের সময় একমুখী চলাচলের মাধ্যমে একইসঙ্গে অধিকসংখ্যক লঞ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে যাত্রী পরিবহন দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো রুটে অতিরিক্ত লঞ্চ সরবরাহ করা সম্ভব।
টার্মিনালে নিরাপত্তা নিশ্চিতে র্যাব, পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত যাত্রী বহন ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হচ্ছে।
লঞ্চ টার্মিনালে ট্রাফিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের অফিসের বার্থিং সারেং মো. মামুন বাংলানিউজকে বলেন, আজ সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত ঢাকা থেকে দেশের ৩৭ টি রুটে ৯২ টিলঞ্চ ছেড়ে গেছে। আর ঢাকাতে এসেছে ৯২ টি লঞ্চ। আজ রাত ১২ টা পর্যন্ত ১২০ টি লঞ্চ ঢাকা থেকে ছেড়ে যাবে। আর গতকাল ১৩৪ টি লঞ্চ দেশের ৩৭ টি রুটে ছেড়ে গেছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, যাত্রীদের চাপ সামলাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যাত্রীদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।