রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। এই চাঙ্গাভাবের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা এমনটাই জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অনেকটা নাজুক।নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নতুন করে অনেকেই বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন। নতুন মন্ত্রী-এমপিসহ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করেছেন। নিজ এলাকায় তারা উন্নয়নের বার্তা দিচ্ছেন।এমন সময় দেশে পালিত হতে যাওয়া মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ফিরেছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বাংলানিউজকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনীতিকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিল সেই দুরবস্থা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার খুব একটা ভালো অবস্থায় নিতে পারেনি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের কিছু পদক্ষেপ অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ফলে এর প্রভাব ঈদের অর্থনীতিতে পড়ছে।
ঈদের আগে ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান বিপণিবিতানগুলো ঘুরেও ঈদের কেনাকাটার মধ্যে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়।
বসুন্ধরা সিটি শপিং মল, যমুনা ফিউচার পার্ক, উত্তরার মাসকট প্লাজা, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, খিলগাঁওয়ের তালতলা মার্কেটসহ অভিজাত বিপণিবিতানগুলোয় ছিল উপচে পড়া ভিড়।
বাংলানিউজসের সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে।
প্রতিটি মার্কেটেই ছিল ঈদকে সামনে রেখে জমজমাট কেনাকাটা। রোজার শেষ দিকে ঢাকার মার্কেটগুলোতে ভিড় কমতে শুরু করলেও জেলা পর্যায়ে চাঁদরাত পর্যন্ত কেনাকাটার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় বিক্রেতারা।
ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে মঙ্গলবার থেকে। ফলে এর পর থেকে ঢাকা ফাঁকা হতে শুরু করেছে। ফলে কেনাকাটা জমে উঠতে শুরু করেছে অন্যান্য জেলাগুলোতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশ অনেকটা স্বস্তিদায়ক থাকলেও এবারের ঈদে কিছুটা বিষন্নতা দেখা দিয়েছিল ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এ থেকে সৃষ্ট জ্বালানী সংকটকে কেন্দ্র করে।
ঈদে জ্বালানীর অভাবে দূরপাল্লার সব গাড়ি চলবে কিনা এমন একটি উদ্বেগ দেখা গেলেও সরকারের দ্রুত পদক্ষেপে জ্বালানী তেলের সংকট অনেকটাই কেটেছে।
ফলে শেষ দিকে সোহাগ পরিবহনসহ একাধিক পরিবহন মালিক বাড়তি কিছু সিডিউলে বাস ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
তাছাড়া সরকার দুটি নৌরুটে ঈদ উপলক্ষে লঞ্চ চলাচলও বাড়িয়েছে।
একই সময়ে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও কৃষক কার্ড চালুর ঘোষণায় গ্রামীণ জনপদসহ দেশের সকল স্থানের নিম্ম আয়ের মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য ফিরেছে।
তাছাড়া সরকারের এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের উদ্যোগের আলোচনাও বেকার জনগোষ্ঠির মধ্যে আশার সঞ্চার ঘটিয়েছে।
সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনেকটা চাঙ্গাভাব দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া ইরান যুদ্ধের মধ্যে এখনও রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রেখেছেন প্রবাসীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও ঈদের আগে রেমিট্যান্স বেড়েছে। ঈদকে ঘিরে প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের স্বজনদের কাছে অর্থ পাঠাচ্ছেন। যুদ্ধের প্রভাব এখনও রেমিট্যান্স প্রবাহে পড়েনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ১ থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ২২০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৬২ কোটি ডলার। শুধু ১২-১৪ মার্চ তিন দিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার মধ্যে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে ওই অঞ্চলের হরমুজ প্রনালী দিয়ে পণ্য রপ্তানি কিছুটা ঝুঁকিতে পড়ে। তবে রেমিট্যান্সে এই মূহুর্তে প্রভাব দেখা না গেলেও ফ্লাইট বন্ধ ও প্রবাসী কর্মীদের বিদেশ যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় অর্থনীতিতে কিছুটা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল কেন্দ্র উপসাগরীয় ছয়টি দেশে নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) তেলসমৃদ্ধ ছয়টি দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। এর মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার ও কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আছেন।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঈদকেন্দ্রীক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। ঢাকার অনেক বাড়ির সামনে ঈদের দিন অতিথি আপ্যায়নের জন্য ইতোমধ্যে পশু কিনে এনে রাখতে দেখা গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঈদের অর্থনীতির আকার কত বড় তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যাণ পাওয়া যায় না। তবে সারা বছর যে পরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, এর প্রায় ৪০ শতাংশ হয় ঈদের সময়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঈদে ই-কমার্সভিত্তিক কেনাবেচা ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
এ ছাড়া ঈদ ঘিরে যাকাত ও সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে গরিব মানুষের হাতেও টাকা পয়সার প্রবাহ বাড়ে।
ফলে সারা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। এবারও সব পেশার মানুষকে দেখা যাচ্ছে উৎসবের জন্য প্রস্তুতি নিতে। ঢাকার নর্দা এলাকায় থাকেন আলফত আলী। তিনি একটি বিদেশি সংস্থার গাড়ির চালক হিসেবে কাজ করেন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, বেতন-বোনাস পেয়েছি সময় মতো। এ কারণে পরিবারের জন্য কেনাকাটা করে রেখেছি আগেভাগেই।
তাছাড়া পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের জন্য সহজ শর্তে ঋণের যোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে পোশাক খাতের শ্রমিকদের মধ্যে ঈদের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আসন্ন ঈদ নতুন সরকারের প্রথম ঈদ। তাই এ ঈদ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে। কারণ নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং সাধারণ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন এটাই স্বাভাবিক।
দোকান মালিক সমিতির হিসাব বলছে, রোজার ঈদে দেশে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। একটি দোকানের প্রতিদিনের গড় বিক্রি ৮০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩ লাখ টাকা হয়। এ ছাড়া কাপড়-চোপড় বিক্রেতাদের সারা বছরের বিক্রির একটি বড় অংশ হয় এই ঈদে।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোশাক খাতে ব্যবসা হয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
এ বিষয়ে এফবিসিসিআইর সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় জনমনে স্বস্তি ফিরেছে। স্বভাবতই গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদের কেনাকাটা ভালো হবে। তবে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকেই দেশের বাইরে কেনাকাটা করতে যেতে পারেননি। অন্যদিকে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে দেশে তৈরি লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, থ্রি পিস বিক্রি বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো (এসএমই) ভালো করছে। তাদের জন্য কিছু প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারলে তারা অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখতে পারবে।