আপনজনদের সঙ্গে ঈদ করতে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পন্টুনে তিল ধারণের জায়গা নেই। গরম ও যানজট উপেক্ষা করে বুধবার সকাল থেকে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হাজারো যাত্রী ভিড় করছেন এই নৌবন্দরে।এতে করে টার্মিনাল এলাকায় তীব্র ভিড়, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে। এদিকে প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রাজধানীবাসীদের। আজ থেকে পোশাক কারখানা ছুটি হওয়ায় বিকেল থেকেই সদরঘাটে চাপ বেড়েছে। ফলে সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (১৮ মার্চ) সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সকালের প্রথম প্রহর থেকেই যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে আগেভাগেই ঘাটে এসে অবস্থান নিচ্ছেন, যাতে নির্ধারিত লঞ্চে উঠতে পারেন। তবে যাত্রীসংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় টিকিট সংগ্রহ ও লঞ্চে ওঠা-দুই ক্ষেত্রেই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। বিশেষ করে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা আসন নিশ্চিত করতে ভিড় জমিয়েছেন।
পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুরের মতো স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরাও নির্ধারিত লঞ্চ ধরে রওনা দিচ্ছেন। তবে প্রতিটি লঞ্চ যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। লঞ্চের ছাদেও যাত্রী নিতে দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কঠোর নজরদারিতে রেখেছে, যেন কোনো লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে না ছাড়ে।
এদিকে ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সদরঘাট ও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে।সেটা রাজধানীর সদরঘাট, লক্ষ্মীবাজার, রায়সাহেব বাজার, ধোলাইখাল, ইংলিশ রোড, বংশাল ও গুলিস্তান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে থেকে বিরক্ত হয়ে তীব্র গরমে অনেক যাত্রীকে গুলিস্তান থেকে হেঁটে সদরঘাটে আসতে দেখা গেছে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নৌ-প্রশাসন জানায়, যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। বারবার মাইকিং করে নিরাপদে যাত্রার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
ঘাটে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন শতাধিক লঞ্চ বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। তবুও যাত্রীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা রুটে যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি। ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষের সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। যাত্রী ওঠানামা, টিকিট সংগ্রহ ও মালামাল বহনে কোনো বিশৃঙ্খলা যেন না হয়, সেজন্য বিভিন্ন স্থানে নজরদারি চলছে। নির্ধারিত সময়েই লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। ঈদের আনন্দে ঘরে ফেরার এই যাত্রা যেন নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়-এটাই এখন যাত্রীদের প্রত্যাশা।
সদরঘাটে কথা হচ্ছিল ৬৫ বছরের কুলসুম বেগমের সঙ্গে। তার বাড়ি যাওয়ার আনন্দ দেখে মন ভরে ওঠে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই বলেন, বরিশালে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে ঈদ করবো। ওদের ছাড়া ঈদ ভালো লাগে না। বাবা, অনেক কষ্ট করে ঘাট পর্যন্ত এসেছি। একটু লঞ্চে ওঠার ব্যবস্থা করে দিতে পারবা? রোজা রেখে এক ঘণ্টা হেঁটে এখানে এসেছি। এত ভিড়ে ভিতরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। বড় ছেলে ও বউ সঙ্গে আছে। সে আমাকে সামলাবে, নাকি ব্যাগ সামলাবে!
গাজীপুরের একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন মো. আমজাত। তিনি বলেন, ছয় মাস পর বাড়ি যাচ্ছি। এবার ছুটি বেশি পেয়েছি, তাই দেরি করিনি। সকালেই চলে এসেছি। আমি যখন এসেছি তখন ভিড় কম ছিল, এখন অনেক ভিড়। এখন আসলে লঞ্চে উঠতে পারতাম না, কারণ আমার সঙ্গে আমার মা ছিল। মাকে নিয়ে এভাবে ভিড় ঠেলে উঠতে পারতাম না।
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে কাজ করেন মো. ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, আজ গুলিস্তান থেকে যানজট। এক ঘণ্টার মতো বাসে বসে ছিলাম, পরে বিরক্ত হয়ে হেঁটে এলাম। এক মাস পর বাড়ি যাচ্ছি। দাদা-দাদির সঙ্গে ঈদ করার আলাদা অনুভূতি আছে। তাদের জন্য শাড়ি ও পাঞ্জাবি কিনেছি। এখন শুধু লঞ্চে উঠতে পারলেই হয়।
এমভি কর্ণফুলী-১০-এর কেরানি মো. নিজামুদ্দিন বলেন, আজ আকাশ মেঘলা, তাই অতিরিক্ত যাত্রী যাতে না ওঠে সেজন্য বারবার মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু এত যাত্রী-কে কার কথা শোনে! বিকেলে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাই সবাই এখন আরও সচেতন। তবে যাত্রীসেবা দিতে আমরা প্রস্তুত। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম নিচ্ছি, কারণ লঞ্চ মালিকরা ১০ শতাংশ ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এছাড়া এবার সদরঘাটের চাপ কমাতে বসিলা ও কাঞ্চন ব্রিজ থেকেও লঞ্চ ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শৌলা, চরদূর্গাপুর, হিজলা, রহমানের চর, ভাসানচর রুটে চলাচলকারী এমভি সম্রাট-৭-এর ম্যানেজার বলেন, ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিনে যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। আজ থেকে গার্মেন্টস ছুটি হওয়ায় পন্টুনে তিল পরিমাণ জায়গা নেই। লঞ্চেও যাত্রীতে পরিপূর্ণ। আমাদের ৬১টি কেবিনের সবই বুকড। ডেকেও জায়গা নেই। ঘাট কর্তৃপক্ষ ছাড়তে বললেই আমরা ছেড়ে যাবো।
বরগুনা, কালিকাবাড়ি, ফুলঝুড়ি, কাকচিড়া, কাঠালিয়া, রাজারহাট রুটে চলাচলকারী এমভি পূবালী-১ লঞ্চের কেরানি বলেন, রাত সাড়ে ৮টায় ছেড়ে যাবে। আজ যাত্রী অনেক বেশি। ঈদ উপলক্ষে আমরা সরকারি রেট থেকে ৫০ টাকা কম ভাড়া নিচ্ছি। ডেকও ভরে গেছে। লঞ্চের ছাদে যারা আছেন, তারা গরমের কারণে গেছেন—লঞ্চ ছাড়লে নিচে নেমে আসবেন।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নৌপথে ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত লঞ্চ সংযোজন, নিরাপত্তা জোরদার এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। সাধারণ সময়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি লঞ্চ চলাচল করলেও বর্তমানে ফিটনেসপ্রাপ্ত ৭৪টি লঞ্চসহ অতিরিক্ত লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঈদের সময় চাহিদা অনুযায়ী এসব লঞ্চ রুটভিত্তিক পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বরিশাল রুটে স্বাভাবিকভাবে ১৬টি লঞ্চ চলাচল করলেও ঈদের সময় একমুখী চলাচলের মাধ্যমে একই সঙ্গে অধিকসংখ্যক লঞ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো রুটে অতিরিক্ত লঞ্চ সরবরাহ করা সম্ভব। আজ দেশের ৩৭টি রুটে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৮০টির বেশি লঞ্চ ঢাকা ছেড়ে গেছে, যা দিন শেষে ১২০ থেকে ১৩০টিতে পৌঁছাবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টার্মিনাল এলাকায় র্যাব, পুলিশ, নৌ-পুলিশ, ডিএমপি পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি নদীপথে নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ছোট নৌকা বা ডিঙ্গি থেকে যাত্রী ওঠা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আগে থেকেই প্রচারণা চালানো হয়েছে।
ভাড়া সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। বরিশাল রুটে যেখানে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৪০৪ টাকা, সেখানে ঈদ উপলক্ষে ১০ শতাংশ কমিয়ে প্রায় ৩৫০ টাকায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি লঞ্চে ভাড়ার তালিকা টানানো রয়েছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভাড়া ও সেবার মান মনিটরিংয়ে একাধিক টিম কাজ করছে বলে জানানো হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য হটলাইন নম্বর চালু রাখা হয়েছে।
লঞ্চের ছাদে যাত্রী নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে কিছু ক্ষেত্রে লঞ্চের ছাদে যাত্রী ওঠার প্রবণতা দেখা গেলেও কর্তৃপক্ষ তা নিরুৎসাহিত করছে। হঠাৎ যাত্রী চাপ বেড়ে যাওয়ায় কিছু সময় নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হলেও দ্রুত অতিরিক্ত লঞ্চ ছাড়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে।
সার্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এবারের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, নতুন সরকারের আমলে যাত্রীসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বিআইডব্লিউটিএ। সদরঘাটকে আরও সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি চালু করা হয়েছে একগুচ্ছ নতুন সুবিধা। ঈদের আগে পাঁচ দিন ও পরে পাঁচ দিন—মোট ১০ দিনের জন্য যাত্রীদের ফ্রি কুলি (পোর্টার) সেবা দেওয়া হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ নিজস্ব অর্থায়নে কুলিদের মজুরি দিয়ে নিয়োগ করায় যাত্রীরা কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন না।
মালামাল বহনে সুবিধার জন্য বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে ১০০টি ট্রলি, যা যাত্রীরা নিজেরাই ব্যবহার করতে পারবেন। অসুস্থ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ারের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০টি গেটে মোট ৪০টি রাখা হয়েছে। ক্যাডেট সদস্যরা এতে সহায়তা করছেন। এছাড়া চাপ সামলাতে অতিরিক্ত দুটি ঘাট চালু করা হয়েছে। লঞ্চ মালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদ উপলক্ষে ভাড়া ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত স্বস্তি যোগ করেছে।