দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম এলাকাগুলোর মধ্যে মিরপুর এখন যেন এক বিশাল জনসমুদ্র। বিপণিবিতানগুলোর পাশাপাশি মিরপুরের ১, ২, ৬, ১০, ১১ ও ১৩ নম্বরের ফুটপাতগুলো এখন ক্রেতাদের দখলে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে বিরতিহীন বেচাকেনা।তবে এই জমজমাট বাণিজ্যের মাঝেও একটা বড় অভিযোগ বারবার সামনে আসছে পণ্যভেদে দাম দ্বিগুণ বা তারও বেশি চাওয়া হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ‘সস্তার স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে পরিচিত মিরপুরের ফুটপাতে এখন চড়া মূল্যের উত্তাপ।
উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ফুটপাতগুলো এখন চেনাই দায়। চারদিকের রাস্তা সংকুচিত হয়ে এসেছে অস্থায়ী দোকানগুলোর কারণে।পাঞ্জাবি, শার্ট, প্যান্ট থেকে শুরু করে জুতো, টুপি এবং কসমেটিকস কী নেই এখানে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তিল ধারণের ঠাঁই নেই মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নাম্বার সেকশনের এর ফুটপাতে। বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের দরদামের শব্দে মুখরিত চারপাশ। তবে ক্রেতাদের চোখেমুখে আনন্দের চেয়ে দুশ্চিন্তার রেখাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শেখ নাসির এসেছেন পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত বছর যে প্যান্ট ৫০০ টাকায় কিনেছি, এবার সেটির দাম চাচ্ছে ১২০০ টাকা। ফুটপাতে যদি শোরুমের দাম দিতে হয়, তবে আমরা সাধারণ মানুষ যাব কোথায়?
কেনাকাটার বৈচিত্র্য ও দামের চিত্র
ফুটপাতে সাধারণত নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ কেনাকাটা করতে এলেও এবার দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। অনেক সচ্ছল পরিবারও ভিড় করছে পাঞ্জাবি কিংবা শিশুদের পোশাকের সন্ধানে।
ফুটপাতে শিশুদের সাধারণ ফ্রক বা সেটগুলো ৮০০ থেকে ১০০০ টাকার নিচে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে।অথচ এগুলো পাইকারি বাজারে অনেক কম দামে পাওয়া যায় বলে ক্রেতাদের দাবি।
পাঞ্জাবি ও শার্ট: কটন ও লিনেন পাঞ্জাবির দাম হাঁকা হচ্ছে ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, কাপড়ের মান ভালো এবং ডিজাইন আধুনিক হওয়ায় দাম বেশি। মিরপুর ১০-এর ফুটপাতে জুতার বিশাল সমাহার। তবে এখানেও দাম নিয়ে চলছে যুদ্ধ। ৪০০ টাকার স্যান্ডেল চাওয়া হচ্ছে ৮০০-৯০০ টাকা।
এদিকে ক্রেতারা অভিযোগ করে বলেন, ফুটপাত এখন শোরুম, ফুটপাতে কেনাকাটা করার প্রধান আকর্ষণ ছিল কম দামে ভালো মানের জিনিস পাওয়া। কিন্তু এবারের ঈদে সেই সমীকরণ যেন পাল্টে গেছে।
গৃহিণী ফাহমিদা জানান, মিরপুর ১১ নম্বরে ফুটপাতে কসমেটিকস ও গয়না কিনতে এসে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দোকানদাররা কম দামে ছাড়তেই চায় না। ফিক্সড প্রাইজ বা এক দরের মতো আচরণ করছে তারা। ৫০০ টাকার নিচে কোনো ভালো ড্রেসই নেই।
ক্রেতাদের অভিযোগ, ফুটপাতের বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শোরুমের চেয়েও বেশি দাম চাওয়ার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
কেন দাম বেশি? কেন দাম বাড়ছে? এই প্রশ্নের জবাবে বিক্রেতাদের কণ্ঠে রয়েছে ভিন্ন সুর। মিরপুর ১০ নম্বরের ফুটপাতের কাপড় বিক্রেতা ওসমান বলেন, আমরা শখ করে দাম বাড়াই না। পাইকারি বাজারে আমাদের এবার দ্বিগুণ দামে মালামাল কিনতে হয়েছে। এছাড়া আছে যাতায়াত খরচ আর রোজা রেখে সারাদিন রোদে পুড়ে ব্যবসা করার কষ্ট।
তবে দাম বাড়ার নেপথ্যে আরও কিছু কারণ উঠে এসেছে বিক্রেতাদের কথায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা জানান, ফুটপাতে দোকান বসাতে হলে তাদের মোটা অঙ্কের ‘লাইনম্যানের চাঁদা’ দিতে হয়। ঈদ উপলক্ষে এই চাঁদার পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ এবং জায়গার পজিশন অনুযায়ী প্রতিদিন বড় অঙ্কের টাকা গুনতে হয় তাদের। এই বাড়তি খরচের বোঝা আল্টিমেটলি ক্রেতাদের ঘাড়েই চাপাতে হয়।
যানজট ও ভোগান্তির চিত্র
মিরপুরের ফুটপাত ছাপিয়ে দোকানগুলো এখন মূল সড়কের অনেকাংশ দখল করে নিয়েছে। এর ফলে মিরপুর ১০ থেকে আগারগাঁও এবং মিরপুর- ১ নম্বর থেকে গাবতলী অভিমুখী রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। কেনাকাটা করতে আসা মানুষ এবং সাধারণ পথচারীদের হাঁটাচলার জায়গা নেই বললেই চলে। পুলিশ সদস্যদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চললেও কয়েক ঘণ্টা পরেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসছে মিরপুরের রাস্তা।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
মিরপুরের মতো ব্যস্ত এলাকায় ঈদ বাজারকে কেন্দ্র করে পকেটমার এবং অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এবারের ঈদে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মোড়ে মোড়ে পুলিশের ওয়াচ টাওয়ার এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে। মিরপুর জোনের একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা ২৪ ঘণ্টা কাজ করছি। ফুটপাতে চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উৎসবের আমেজ বনাম অর্থনৈতিক চাপ
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে ঈদ আনন্দ ফিকে হয়ে আসছে অনেকের জন্য। তবুও সাধ্যের মধ্যে সেরাটা খুঁজে নিতে মানুষ ছুটছে মিরপুরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দিনশেষে ঈদ মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দের বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে নতুন পোশাক। কিন্তু ফুটপাতের এই চড়া দাম সাধারণ মানুষের সেই খুশিতে কিছুটা হলেও ভাটা ফেলছে।
মিরপুরের ফুটপাতে ঈদের বেচাকেনা জমে উঠলেও ক্রেতা অসন্তোষ একটি বড় চিন্তার বিষয়। যথাযথ তদারকি এবং পাইকারি বাজার থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত দামের ভারসাম্য বজায় রাখা না গেলে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ঈদ আনন্দ কেবল দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে। ক্রেতাদের দাবি, প্রশাসন যেন কেবল যানজট নিরসন নয়, পণ্যের যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করতেও মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে।