নোনা পানির আগ্রাসনে হুমকিতে মিঠা পানির উৎস

নোনা পানির আগ্রাসনে হুমকিতে মিঠা পানির উৎস

খুলনা উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে তীব্র আকার ধারণ করেছে মিঠা পানির সংকট। উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং চিংড়ি চাষে লবণ পানি ব্যবহারের ফলে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকায় সুপেয় পানির উৎস দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।এতে গরম মৌসুম এলেই নিরাপদ পানির জন্য চরম দুর্ভোগে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পানি সংগ্রহে নারী, পুরুষ ও শিশুদের প্রতিদিন পাড়ি দিতে হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার পথ।

অনেক ক্ষেত্রে চড়া দাম দিয়েও মিলছে না পানযোগ্য পানি। নিরাপদ উৎসের অভাবে অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যবহার করছেন পুকুরের দূষিত পানি, যার ফলে ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ নানা রোগব্যাধি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

‘আমাগের এহেনে কলের পানি নোনা। আগে পুকুরের পানি খাতি পাততাম, এহন তাও নোনা।পানির কষ্টে বুক ধরফর করে। সরকারি পাম্পের পানি আমরা গরিবরা পাই না। সব বড়লোকরা পায়। কলসি কইরে বৃষ্টির পানি ধরে আইনে রাহি। আর কিছু দূরে মিশিন নুনাপানি মিষ্টি করে, সেহানথে ৫ টাকা কলসি কিনে আনতি হয়’- বাংলানিউজকে আক্ষেপের সুরে এমন কথা বলেন কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী পবনা ক্লোজার এলাকার সেলিনা বেগম। দীর্ঘদিন ধরে মিঠা পানির জন্য সংগ্রাম করছেন তিনি ও তার পরিবার। 

মিঠা পানির আরেক ভুক্তভোগী মহারাজপুর ইউনিয়নের দেয়াড়ার ভ্যানচালক আকরামের স্ত্রী তাসলিমা খাতুন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘বড় মায়্যেডার পেটে অসুক। কলের পানি খালি পারে রোগ বাড়ে। পাম্প থে পানি দেয়ার অফিসে মেলাবার গেসি। চেয়ারম্যান-মেম্বারগের কইছি। আমাগের কপালে পাম্পের পানি জোটে না। আমলীগের (আওয়ামী লীগ) আমলে ১০ থে ১২ হাজার ট্যাকা লাগতো, মনে করিলাম এহন পাবো। তাও কেউ দেচ্ছে না। সহলে খালি কথা দেয়, কিন্তু কেউ রাখতিসে না।’

দাকোপের ছিটেবুনিয়ার লাইনির খাল এলাকার রহিম শিকদার বলেন, ‘বৃষ্টির পানির জন্যি আকাশের দিক তাকাই থাকি। আল্লাহরে কই, আল্লাহ বৃষ্টি দ্যাও। আর বৃষ্টি হইলে যেন এমনভাবে হয় যাতে অনেক দিন থাকে। ১২ মাসের মদ্যি বর্ষাকলে তিন-চাইড্ডে মাস আমরা একটুখানি ভালো থাকি। আর সব সময় পানির জন্যি অনেক ভোগান্তি পোহাতি হয়। খালে বিলে পানি আছে, কিন্তু আমরা যা পাই তা নুনা।’

পাইকগাছার তরমুজ চাষী শাফায়াত হোসেন জানান, কুংখালী ও বাইনবাড়িয়া এলাকায় মিষ্টি পানির অভাবে ২০০-৩০০ বিঘা জমিতে তরমুজ গাছ পুড়ে গেছে। ঘোষখালী নদীর বেড়ি বাঁধ ভেঙে লবণ পানি ঢুকে তরমুজ চাষিদের এ সর্বনাশ।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা এলাকার আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমগের মিষ্টি পানির যে কি কষ্ট। সারাদিনের আধাবেলা যায় পানি আনতি। আমরা পানির মধ্যি বাস কললিও খাওনের পানি পাই না। খুব কষ্ট খাবার পানির। ‘

বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের উত্তরকুমারীয়া জোলার এম রহমান বাংলানিউজকে জানান, লবণাক্ততার কারণে তাদের এলাকার একটি পুকুরও ব্যবহারযোগ্য নেই। নলকূপের পানিও লবণাক্ত। বাধ্য হয়েই তারা সেটি পান করেন। তার অভিযোগ, বহুবার বহু স্থানীয় কর্তা-ব্যক্তি, সরকার সংশ্লিষ্টদের বলেও এর কোনো সমাধান কখনোই করেননি।  

একই অবস্থা মোংলা চিলা এলাকার মানুষের। অন্তত এক-দেড় কিলোমিটার দূর থেকে স্থানীয়দের পানি নিয়ে আসার কষ্ট বহুদিনের। দিনে অন্তত ২-৩ বার তাদের পানি বহন করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আসমা বলেন, ‘পানির কষ্টটা আমাগের যায় না। আশপাশের সব পানিতে লবণ। যে পুকুরের থে পানি আনি সেহানে একটু লবণ কম। কোনো সমাধান না পায়ে কষ্ট কইরে এ পানি ব্যবহার করি।’

সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে নিরাপদ পানির সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়, বরং তা ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার অন্তত ১০ থেকে ১২টি উপজেলার মানুষ বছরের পর বছর ধরে নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছেন। এই সংকট সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে নারীদের ওপর, যাদের অনেকেই প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হন। আবার অনেক পরিবার পানির জন্য অর্থ ব্যয় করে কিনে ব্যবহার করছেন, যা তাদের অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপকূলীয় এলাকায় পানির সংকট দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছে। শুধু পানীয় জলই নয়, কৃষিকাজ ও গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় পানির অভাবও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এলাকার অধিকাংশ পুকুর, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবুও বিকল্প কোনো উৎস না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে এই লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছেন। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকের রোগসহ নানা শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বৈশাখের তীব্র তাপদাহ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রখর রোদ উপেক্ষা করে মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি সংগ্রহ করা যেন উপকূলবাসীর দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই অঞ্চলের পানির উৎসগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পুকুর এখনো লবণাক্ত ও দূষিত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফিটকিরি ব্যবহার করেও সেই পানি পুরোপুরি পানযোগ্য করা যায় না।

এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, উপকূলজুড়ে সুপেয় পানির এই সংকটের টেকসই সমাধান কবে মিলবে? স্থানীয়দের মতে, সাময়িক প্রকল্প বা সীমিত উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিগত সমাধান। তা না হলে এই সংকট আরও গভীর হয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।

দক্ষিণাঞ্চলের ৩ জেলায় ৩০ লাখ মানুষ সুপেয় পানির সংকটে
খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা; এই তিন জেলায় লবণাক্ততা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ সরাসরি নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছেন। বিশেষ করে খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটা; বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল, শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলায় সংকট সবচেয়ে তীব্র।

স্থানীয়দের ভাষায়, পানির কষ্ট এখানে শুধু দৈনন্দিন দুর্ভোগ নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লবণাক্ততার কারণে মিঠা পানির উৎসগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে, আর গরমের মৌসুম এলেই পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার নেয়।

খুলনা জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মুকুল এ সংকটের পেছনে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী না করে মানুষের ভূমিকার দিকেও আঙুল তুলেছেন। বাংলানিউজকে তিনি জানান, একসময় উজানের পানি স্বাভাবিক প্রবাহে এসে সাগরের লবণাক্ততাকে নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণ পানি সহজেই লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ; যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে লবণ পানি তুলে আনা হচ্ছে, ফলে আশপাশের মাটি ও পানির উৎস আরও লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। এই দুই কারণ মিলেই প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

সমাধানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কেবল ট্যাংকিতে পানি সংরক্ষণ বা অস্থায়ী উদ্যোগে এই সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়। বরং নদ-নদীতে লবণ পানি প্রবেশ বন্ধ করা, উজানের পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া গেলে অন্তত শুষ্ক মৌসুমে বিশুদ্ধ পানির সংকট কিছুটা লাঘব করা সম্ভব।’

প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সুফল আসেনি
উপকূলীয় অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় সরকার রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেমমহ (ঘরের চালার ওপর পড়া বৃষ্টির পানি পাইপ দিয়ে ট্যাংক বা পাত্রে ধরে রাখার পদ্ধতি) বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও বাস্তবে এর সুফল খুব কম মানুষই পেয়েছেন। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন এবং রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ইউনিট স্থাপনের কাজ করা হয়েছে। এসব সুবিধা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশের কাছে পৌঁছায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন স্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে, যা পুরো উদ্যোগের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদ বাংলানিউজকে জানান, উপকূলীয় অঞ্চলের পানিসংকট নিরসনে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। গত পাঁচ বছরে খুলনায় রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার ৮৩১টি পানির ট্যাংকি বিতরণ এবং ৯ হাজার ৮২৬টি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। বাগেরহাটে এই প্রকল্পের আওতায় ২৮ হাজার ১০০টি ট্যাংকি বিতরণ এবং ৪ হাজার ৪৮৮টি নলকূপ স্থাপন করা হয়। একই সময়ে সাতক্ষীরায় ৩১ হাজার ৯৯৫টি পানির ট্যাংকি বিতরণ এবং ৭ হাজার ১১৯টি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।

45

উপকূলে কেন লবণাক্ততা বাড়ছে?
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি বাংলাদেশের একটি বড় পরিবেশগত ও কৃষি-সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী দেশের সবচেয়ে বেশি লবণাক্ততাপ্রবণ জেলা হিসেবে চিহ্নিত। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) বলছে, এই পরিস্থিতির পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুই ধরনের কারণই সমানভাবে দায়ী।

প্রতিষ্ঠানটির চিহ্নিত প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, চিংড়ি চাষে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের প্রবণতা, স্লুইসগেট ও পোল্ডারের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিতভাবে সাগরের লবণাক্ত পানির প্রবেশ। এসব কারণে মাটি ও পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মোট কৃষিজমির প্রায় ৩০ শতাংশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। এর মধ্যে প্রায় ২৮ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর জমি কোনো না কোনোভাবে লবণাক্ততার প্রভাবে আক্রান্ত। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে ১০ দশমিক ৫৬ লাখ হেক্টর জমি ইতোমধ্যেই তীব্র লবণাক্ততার শিকার, যা কৃষি উৎপাদনের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই সংকট আরও দ্রুত বাড়ছে।

এসআরডিআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক কৃষিবিদ বিধান কুমার ভান্ডার বাংলানিউজকে বলেন, ‘লবণাক্ততা বৃদ্ধির পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুই ধরনের কারণ রয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির দুটি প্রধান প্রাকৃতিক কারণ হলো- জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানি জমিতে ঢুকে পড়া এবং ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানির কৈশিক ক্রিয়ার মাধ্যমে মাটির উপরে উঠে আসা।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, শুষ্ক মৌসুমে (মার্চ থেকে মে) জোয়ারের লবণাক্ত পানি অনেক সময় কৃষিজমি তলিয়ে দেয়। সেই পানি আবার সেচ কাজে ব্যবহার করলে মাটিতে লবণ জমে যায়। অন্যদিকে বর্ষা শেষে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে মাটি শুকাতে শুরু করে, তখন ফাটল তৈরি হয়। সূর্যের তাপে উপরের পানি বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার ফলে নিচের স্তরের লবণাক্ত পানি সেই ফাটল দিয়ে উপরে উঠে আসে এবং জমির উপরিস্তরকে লবণাক্ত করে তোলে।

এছাড়া মানবসৃষ্ট কারণও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় লবণ পানি ব্যবহার করে চিংড়ি চাষের প্রবণতা মাটির লবণাক্ততা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস করছে।

পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাটি-পানির লবণাক্ততা
উপকূলীয় অঞ্চলে মাটি ও পানির লবণাক্ততা এখন একসঙ্গে বাড়তে থাকা একটি গভীর পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরই শুধু লবণাক্ত জমির পরিমাণ নয়, এর তীব্রতাও বাড়ছে। বিশেষ করে সামান্য ঝড়বৃষ্টি হলেই বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণ পানি ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। একবার লবণ পানি ঢুকলে তা মাটি ও পানিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে রাখে।

এ অঞ্চলে মাটি ও পানির লবণাক্ততার মাত্রা সাধারণত ৬ থেকে ১৫ ডিএস/মিটার পর্যন্ত ওঠানামা করে, তবে কিছু এলাকায় এর চেয়ে অনেক বেশি দেখা যায়। উপকূলীয় কিছু এলাকায় ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, যা কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। লবণাক্ত জমিতে ফলন অনুকূল এলাকার তুলনায় অনেক কম হয়। সেচের পানির অভাবে বোরো মৌসুমে অনেক জমি পতিতও থেকে যায়।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দিলরুবা করিম বিভিন্ন উপজেলার মাটি ও পানির লবণাক্ততার চিত্র তুলে ধরেছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—

খুলনার পাইকগাছায় মাটির লবণাক্ততা জানুয়ারিতে ৫.৬; ফেব্রুয়ারিতে ৫.৯ এবং মার্চে ৮.৫ ডিএস/মিটার পর্যন্ত ওঠে। কয়রায় জানুয়ারিতে ১২.৮, ফেব্রুয়ারিতে ৬.৬ এবং মার্চে ৭.২ ডিএস/মিটার রেকর্ড করা হয়। দাকোপে জানুয়ারিতে ৮.১, ফেব্রুয়ারিতে ৬.২ এবং মার্চে ৭.২ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা দেখা গেছে।

পানির লবণাক্ততার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। কয়রায় জানুয়ারিতে পানির লবণাক্ততা ছিল ১৩.৩ ডিএস/মিটার, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে ২৫.৩ এবং মার্চে পৌঁছায় ৩২.২ ডিএস/মিটার। দাকোপে জানুয়ারিতে ৩.২ ডিএস/মিটার থেকে ফেব্রুয়ারিতে ১২.৯ এবং মার্চে ২৩.৯ ডিএস/মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

সাতক্ষীরার আশাশুনিতে জানুয়ারিতে পানির লবণাক্ততা ৭.০৯ ডিএস/মিটার এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৮.১০ ডিএস/মিটার পর্যন্ত ওঠে। কালিগঞ্জে জানুয়ারিতে ৫.২৫ এবং ফেব্রুয়ারিতে ১২.৬২ ডিএস/মিটার রেকর্ড করা হয়। শ্যামনগরে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক, যেখানে জানুয়ারিতে লবণাক্ততা ছিল ১৬.৫৪ ডিএস/মিটার এবং ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ২৮.৪০ ডিএস/মিটার পর্যন্ত পৌঁছে।

45

উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা এখন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং লবণ পানি ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপকে সবচেয়ে জরুরি সমাধান হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার জানান, উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ এখনো ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চাহিদার তুলনায় পানি উত্তোলন না হওয়ায় সেই ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। এর পাশাপাশি বহু প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় মিঠা পানির উৎস আরও সংকুচিত হয়েছে।

বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিঠা পানির সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বড় আকারের পুকুর, দিঘি ও খাল পুনঃখনন করে সেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাসজমিতে পরিকল্পিতভাবে মিঠা পানির আধার তৈরি করলে স্থানীয়ভাবে পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো সম্ভব হবে।’

অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার আরও মনে করেন, শুধু সংরক্ষণ নয়, ব্যবস্থাপনার দিকেও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তার মতে, বেড়িবাঁধ কেটে বা পাইপ বসিয়ে নদী ও খাল থেকে চিংড়ি ঘেরে লবণ পানি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। এই ধরনের কার্যক্রম বন্ধ না করলে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও পানিসংকট আরও বাড়তে থাকবে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল, ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডিসিপ্লিনের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. শেখ মোস্তাসিম বিল্লাহ বাংলানিউজকে জানান, উপকূলের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে সুপেয় পানির সংকটে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় খাল, বিল, নদী ও নালার নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। কোথাও দীর্ঘ সময় লবণ পানি আটকে রাখা উচিত নয়, বরং মিঠা পানির সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লবণাক্ততার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘চিংড়ি চাষের জন্য লবণ পানি আটকে রাখার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন উভয়কেই বিপর্যস্ত করতে পারে। একসময় যেখানে ধান ও মাছ উভয়ই উৎপাদিত হতো, সেখানে এখন ধান উৎপাদন প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে মাছ চাষও ঝুঁকির মুখে পড়বে।’ একই সঙ্গে তিনি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন, যাতে ধীরে ধীরে লবণাক্ততার মাত্রা কমানো সম্ভব হয়। তার মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে উপকূল আরও ভয়াবহ সংকটে পড়বে, এমনকি সুন্দরবনের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তিনি কৃষকদের উদ্দেশে বলেন, ‘লবণাক্ত এলাকায় ধান চাষ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে, কারণ ধান কাটার পর অবশিষ্ট অংশ মাটিতে জৈব সার হিসেবে কাজ করে, যা মাটির লবণাক্ততা কমাতে সহায়তা করে।’

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পানি গবেষক ড. নাদিম রেজা খন্দকার বাংলানিউজকে বলেন, ‘নিরাপদ পানি মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখনো লবণাক্ত ও অনিরাপদ পানির সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।’ তিনি মনে করেন, এই সংকটের সমাধান টেকসই ও স্থানীয় উপযোগী প্রযুক্তির মধ্যে নিহিত, যা ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে।

তিনি জানান, তার গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলে তারা দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পব্যয়ী সমাধান নিয়ে কাজ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততামুক্ত নলকূপ স্থাপন, পানির লবণাক্ততা সহজভাবে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পানির পারস্পরিক ব্যবহার নিশ্চিত করার সামাজিক উদ্যোগ। 

তিনি আরও বলেন, ‘গভীর নলকূপ স্থাপন সবসময় নিরাপদ নয়, কারণ ভূগর্ভস্থ জলাধার লবণাক্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে তা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।’

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর খনন, সহজ ফিল্টার প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ঘরোয়া পর্যায়ে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ব্যবস্থাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎনির্ভর জটিল প্রযুক্তির পরিবর্তে সহজ ও স্থানীয়ভাবে ব্যবহারযোগ্য পাতন পদ্ধতি উন্নয়নের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সুন্দরবন গবেষক মো. সামিউল হক বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট বহুস্তরীয় কারণের ফল। এর মধ্যে রয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সরকারি জলাশয় ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম। এসব কারণে উপকূলীয় মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছে, যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন জটিলতা, নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অপরিণত শিশুর জন্মহার বাড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘লবণ পানির প্রভাবে সুন্দরবনের মিঠা পানিনির্ভর জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এটি একটি জাতীয় সমস্যা, যার সমাধানে টেকসই প্রকল্প, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি।’

পানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরেফিন বাংলানিউজকে জানান, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সংকটে রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষই পানি কিনে ব্যবহার করেন। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের এই সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, সমন্বিত পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি; যা একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে সুপেয় পানির সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS