প্রেক্ষাগৃহের আলো নিভে গেলে পর্দায় ভেসে উঠত এক মুখ—চোখে গভীরতা, ঠোঁটে আধখানা রহস্যময় হাসি। রুনা লায়লার গাওয়া ‘চঞ্চলা হাওয়ারে’ গানের দৃশ্যে যাঁকে দেখেছিলেন দর্শক, তাঁকে ভুলে থাকা কঠিন। তিনি অলিভিয়া। একসময় সাহসী উপস্থিতি আর গ্ল্যামারের অভিঘাতে ঢালিউডকে নতুন আলোচনায় এনে দেওয়া এই নায়িকা আজ তিন দশকের বেশি সময় ধরে অন্তরালে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ছিল তাঁর জন্মদিন। সেদিন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসেছে স্মৃতি, ছবি, বিস্ময়—কিন্তু মানুষটি নিজে রয়ে গেছেন আড়ালেই।
অলিভিয়াকে আর দেখা যায় না প্রিমিয়ার, উৎসব বা চলচ্চিত্র সংগঠনের আড্ডায়। তবু সহশিল্পীদের স্মৃতিচারণায় তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। ছোট ছোট সেই গল্প, প্রবীণ চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের অল্প সময়ের দেখা আর কিছু উষ্ণ আলাপ—এসব মিলিয়েই আজ অলিভিয়া যেন হয়ে উঠেছেন স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা এক রহস্যময় আলোর রেখা।
যেমন জন্মদিন ঘিরে গতকাল সকাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে আসে সেই পুরোনো পোস্টার, সাদাকালো স্থিরচিত্র আর রঙিন পোস্টারের স্মৃতি। কেউ লিখেছেন, ‘ঢালিউডের সবচেয়ে রহস্যময় নায়িকা’; কেউ আবার শেয়ার করেছেন ‘দ্য রেইন’ কিংবা ‘বহ্নিশিখা’র দৃশ্য। চলচ্চিত্র–অনুরাগীদের বিভিন্ন গ্রুপে তাঁর সাহসী উপস্থিতি, গ্ল্যামারাস ইমেজ আর আকস্মিক অন্তর্ধান নিয়ে শুরু হয় নতুন করে আলোচনা। অনেকেই আক্ষেপ করেছেন—এত আলোচিত এক তারকার আজ কোনো প্রকাশ্য ঠিকানা নেই। কেউ কেউ পুরোনো ম্যাগাজিনের কাটিং তুলে ধরে স্মরণ করেছেন তাঁর ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল সময়কে। দিনভর এমন স্মৃতিচারণায় অলিভিয়া যেন ফিরে এসেছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে, অথচ বাস্তবে তিনি রয়ে গেছেন আগের মতোই নীরব, অধরা।
করাচি থেকে মগবাজার
১৯৫৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের করাচিতে জন্ম অলিভিয়ার। পরিবারটির আদি নিবাস ভারতের গোয়া—খ্রিষ্টান ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবার। দেশভাগের টালমাটাল সময় পেরিয়ে তাঁদের পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসে।

দ্য রেইন ছবিতে ‘আয় রে মেঘ আয় রে’ গানের দৃশ্যে অলিভিয়া ও ওয়াসিম
ঢাকার মগবাজারের ইস্পাহানি কলোনির একটি গলিতেই কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। তিন ভাই ও চার বোনের বড় সংসারে বেড়ে ওঠা অলিভিয়া ছোটবেলা থেকেই ছিলেন কিছুটা আলাদা—চুপচাপ, আবার আত্মবিশ্বাসীও।
ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পড়াশোনার সুবাদে অল্প বয়সেই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ছোঁয়া পান। পোশাক–আশাক, উচ্চারণ, আচার–আচরণ—সবকিছুতেই ছিল একধরনের স্বতন্ত্রতা। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, সেই সময়ের ঢাকায় এমন আধুনিক উপস্থিতি খুব বেশি দেখা যেত না। কৈশোরেই তাঁর সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্ব নজর কাড়ে আশপাশের মানুষের।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে মডেলিং শুরু করেন। তখনকার জনপ্রিয় কিছু পণ্যের বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজের সুযোগ পান। ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে তাঁর দ্বিধা ছিল না; বরং আলো–ক্যামেরার পরিবেশ তাঁকে স্বচ্ছন্দ করে তুলত। পরিবারের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল বলেই একসময় চাকরি নেন হোটেল পূর্বাণীতে রিসেপশনিস্ট হিসেবে।
হোটেলের লবিতে বসে অতিথিদের স্বাগত জানানো সেই তরুণীকে দেখেই কয়েকজন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট মানুষের নজর যায় তাঁর দিকে। লম্বা গড়ন, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি, ইংরেজিতে সাবলীল কথা বলা—সব মিলিয়ে তিনি আলাদা হয়ে উঠেছিলেন। সেখান থেকেই শুরু হয় সিনেমার প্রস্তাব আসা। খুব দ্রুতই বদলে যায় জীবনের গতিপথ—মগবাজারের এক তরুণী পা রাখেন রুপালি পর্দার জগতে।
আলোড়ন থেকে আলোচনায়: ‘মাসুদ রানা’ থেকে ‘বহ্নিশিখা’
১৯৭২ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা এস এম শফিকে বিয়ে করার পরই অলিভিয়ার জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। একই বছর শফির পরিচালিত ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ ছবির মাধ্যমে তাঁর রুপালি পর্দায় অভিষেক। শুরুটা ছিল কিছুটা পরীক্ষামূলকও।কিন্তু প্রথম ছবিতেই তাঁর পর্দা–উপস্থিতি নজর কাড়ে। লম্বা গড়ন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর সাবলীল শরীরী ভাষা—সব মিলিয়ে তিনি আলাদা হয়ে উঠেছিলেন সমসাময়িক নায়িকাদের ভিড়ে।
১৯৭৪ সালে ‘মাসুদ রানা’ ছবিতে সাহসী রূপে হাজির হয়ে অলিভিয়া ভেঙে দেন প্রচলিত রক্ষণশীলতার সীমারেখা। সে সময়ের মূলধারার বাংলা চলচ্চিত্রে খোলামেলা আবেদনময় উপস্থিতি ছিল বিরল, দু–একটা ব্যতিক্রম ছাড়া। অলিভিয়া সেই চিত্রনাট্যেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাজির হন। কেউ সমালোচনা করেছেন, কেউ বিস্মিত হয়েছেন—কিন্তু দর্শকের চোখ এড়িয়ে যাননি তিনি। খুব দ্রুতই তাঁর সঙ্গে জুড়ে যায় ‘গ্ল্যামার গার্ল’ উপাধি। তবে গ্ল্যামারের আড়ালে ছিল একধরনের সচেতন অভিনয়বোধ; তিনি জানতেন ক্যামেরা কীভাবে তাঁকে ধারণ করছে আর দর্শক কীভাবে তাঁকে দেখছে।
১৯৭৬ সাল তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ‘দ্য রেইন’ মুক্তির পর অলিভিয়া উঠে আসেন আলোচনার কেন্দ্রে। বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষায় নির্মিত এই ছবিতে নায়ক ওয়াসিমের সঙ্গে তাঁর রসায়ন ছিল অনবদ্য। রুনা লায়লার কণ্ঠে গাওয়া ‘চঞ্চলা হাওয়ারে’ গানের দৃশ্যে অলিভিয়ার উপস্থিতি দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে। গান, বৃষ্টি, ক্যামেরার মুভমেন্ট—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন অনন্য।
একই বছরে মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘বহ্নিশিখা’ ছবিতে অভিনয় করে অলিভিয়া অর্জন করেন এক বিরল সম্মান। বাংলাদেশের নায়িকাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম, যিনি উত্তম কুমারের বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিতে সুপ্রিয়া দেবীর উপস্থিতি থাকলেও অলিভিয়ার চরিত্রটি ছিল কাহিনির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—এক গোয়েন্দার বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে তাঁকে দেখা যায় দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে। কলকাতার দর্শকও তখন তাঁর নাম জানতে শুরু করে।
এই কয়েক বছরের মধ্যেই অলিভিয়া প্রমাণ করেন, তিনি কেবল সাহসী পোশাকের গ্ল্যামার–আইকন নন; বরং সময়ের চেনা ছক ভেঙে নিজের জায়গা তৈরি করা এক শিল্পী। আলোড়ন তুলেই তিনি পৌঁছে যান আলোচনার কেন্দ্রে—যেখানে তাঁর নাম উচ্চারিত হতে থাকে বিস্ময়, আকর্ষণ আর কৌতূহল নিয়ে।
সহশিল্পীদের চোখে অলিভিয়া
কিছুদিন আগে চিত্রনায়িকা ববিতার সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠেছিল অলিভিয়ার প্রসঙ্গ। কথা বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠে ভেসে উঠেছিল একধরনের মায়া আর নস্টালজিয়া। ববিতার স্মৃতিতে অলিভিয়া কেবল গ্ল্যামারাস নায়িকা নন, ছিলেন সংবেদনশীল, ভদ্র ও ভীষণ সম্মানপ্রবণ এক সহকর্মী। বনানীর একটি পারলারে বছর দুই–তিন আগে হঠাৎ দেখা হয়েছিল তাঁদের। ‘আমাকে দেখে সালাম করলেন, জড়িয়ে ধরলেন। কিছুক্ষণ গল্প করলাম। কিন্তু কোথায় থাকেন, কী করছেন—এসব জানতে চাইনি। বুঝেছি, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না,’ বললেন ববিতা।
স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ববিতা আরও জানান, একসঙ্গে চার–পাঁচটি ছবিতে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁদের। শুটিংয়ের ফাঁকে অলিভিয়া খুব প্রাণখোলা হাসতেন, আবার হঠাৎই চুপচাপ হয়ে যেতেন। সহশিল্পীদের প্রতি তাঁর ছিল অদ্ভুত এক শ্রদ্ধাবোধ। কাউকে সুন্দর লাগছে বললে শিশুর মতো খুশি হতেন। মজা করে বলতেন, ‘এই, কী খাবেন? মিষ্টি খাবেন?’
বরেণ্য অভিনেত্রী শবনমের সঙ্গেও কয়েক বছর আগে রাজধানীর বারিধারার এক পার্কে হঠাৎ দেখা হয়েছিল অলিভিয়ার। দুজনই হাঁটতে বের হয়েছিলেন। কিছুক্ষণ কথা, কুশল বিনিময়—তারপর আবার যাঁর যাঁর পথে হাঁটা। এরপর আর দেখা হয়নি।
শুটিং–স্মৃতির মধ্যে আছে মজার গল্পও। ববিতা হাসতে হাসতে বলেন, ‘জমিদারবাড়িতে শুটিং হলে অলিভিয়া রাতে বাইরে বের হতেন না। বলতেন, “আমার না ভূতের ভয় আছে।”’ গ্ল্যামারাস পর্দা–ইমেজের আড়ালে এমন সহজ–সরল, ভীতু মনের অলিভিয়াকেই মনে রেখেছেন সহশিল্পীরা।
গ্ল্যামারের আড়ালে শিল্পীসত্তা
প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে ৫৩টি ছবিতে অভিনয় করেন অলিভিয়া। উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘মাসুদ রানা’, ‘দ্য রেইন’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ’, ‘শ্রীমতী ৪২০’, ‘যাদুর বাঁশি’, ‘লাল মেমসাহেব’, ‘হিম্মতওয়ালী’, ‘ডার্লিং’, ‘শাপমুক্তি’, ‘একালের নায়ক’, ‘দুশমনি’ প্রভৃতি। তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ‘দুশমনি’ (১৯৯৫)। এরপর ক্রমে নিজেকে সরিয়ে নেন। শোনা যায়, স্বামী এস এম শফির সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যু অলিভিয়াকে ভেঙে দেয়। দর্শক তাঁকে গ্ল্যামারেই বন্দি করেছিল, কিন্তু সহকর্মীদের মতে, তিনি ছিলেন ভীষণ মনোযোগী ও নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী।
কেন এই অন্তরাল?
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি বা পরিচালক সমিতির কাছেও অলিভিয়ার বর্তমান ঠিকানা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট আড্ডায় তাঁর নাম উচ্চারিত হয়, কিন্তু উপস্থিতি নেই। ব্যবহৃত পুরোনো মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। বিভিন্ন সূত্রে ব্যক্তিগত জীবনে পরিবর্তনের কথা শোনা যায়, তবে সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। যাঁরা মাঝেমধ্যে তাঁর দেখা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন, তাঁদের ভাষ্য—অলিভিয়া আলোচনার বাইরে থেকেই জীবন কাটাতে চান।
বিভিন্ন সূত্রে শোনা যায়, পরবর্তী সময়ে তিনি এক টেক্সটাইল ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেছেন। তবে এসব তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। যাঁরা মাঝেমধ্যে হঠাৎ তাঁর দেখা পেয়েছেন—কোনো পার্কে, কোনো পারলারে—তাঁদের ভাষ্য একটাই: অলিভিয়া নিজের মতো থাকতে চান। অতীতের আলোচনায় ফিরতে চান না, সংবাদমাধ্যমের সামনে আসতে চান না।
একজন নায়িকা, যিনি একসময় সাহসী পোশাক ও গ্ল্যামারাস উপস্থিতির মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিলেন, তিনিই আজ বেছে নিয়েছেন নিভৃত জীবন। পর্দার ঝলকানির বিপরীতে বাস্তবের নীরবতা—এই বৈপরীত্যই তাঁকে আরও রহস্যময় করে তোলে। ঢালিউডের ইতিহাসে অলিভিয়ার অবস্থান অনন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে এভাবেও বলেছেন একজন নেটনাগরিক, আলো থেকে সরে গিয়ে কি তিনি খুঁজে পেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত শান্তি? সে প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেই হয়তো দিতে পারবেন। তবে নিশ্চিত করে বলা যায়, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম থাকবে এক উজ্জ্বল অথচ অধরা আলোর মতো—যাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না, তবু ভুলে থাকা যায় না।