পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেও জনসমর্থন পাব

পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেও জনসমর্থন পাব

দেশের জন্য দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি তার মা খালেদা জিয়ার কাছ থেকেই এই দায়িত্ব পালনের শিক্ষা পেয়েছেন বলেও জানান। তিনি মনে করেন, নিজের পরিকল্পনার মাত্র ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেও দেশের মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে। 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই আত্মবিশ্বাস তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান।

লন্ডনে প্রায় দেড় যুগ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর এটাই তার প্রথম সাক্ষাৎকার, যা গত বুধবার টাইম ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে।

সাক্ষাৎকারে নিজের দেশে ফেরার উদ্দেশ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নিজের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুর্নীতির মামলা, শেখ হাসিনার শাসনামল ও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। তিনি বলেন, ‘আমার শরীর এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে।’

নিজের ব্যক্তিত্বের একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে খুব বেশি কথা বলতে পারি না। কিন্তু কেউ যদি আমাকে কোনো কাজ দেন, আমি আমার সেরাটা দিয়ে সেটা করার চেষ্টা করি।’

তারেক রহমান দেশে ফেরার সপ্তাহের মধ্যেই মারা যান তার মা দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মায়ের মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার হৃদয়টা ভীষণ ভারী হয়ে আছে।

অশ্রুচোখে তিনি বলেন, ‘কিন্তু তার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি তা হলো, আপনার ওপর যদি কোনো দায়িত্ব এসে পড়ে, তাহলে সেটা আপনাকে পালন করতেই হবে।’

টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে দুটি পরিবারের আধিপত্য। এর মধ্যে জিয়া পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে এখন তারেককেই চিন্তা করা হয়। আরেকটি পরিবারের নেতৃত্বে আছেন শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে শেখ হাসিনা। তবে মা-বাবার পরিচয়ে আজকের অবস্থানে এসেছেন বলে মনে করেন না তারেক রহমান।

তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবার বদৌলতে নয়, বিএনপির সমর্থকদের জন্যই আমি বর্তমান অবস্থানে এসেছি।’ তার বিশ্বাস, দেশের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় তিনিই সঠিক ব্যক্তি।

দেশে ফেরার পর থেকে নিজের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন তারেক রহমান। তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খননের কথা বলেছেন। ভূমি অবক্ষয় রোধে বছরে পাঁচ কোটি গাছ লাগানো; ঢাকায় ৫০টি উন্মুক্ত সবুজ স্থান গড়ে তোলা; বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা; প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি কলেজ পুনর্গঠন এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ প্রণয়নসহ নানা পরিকল্পনার কথা তিনি শুনিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি যা যা পরিকল্পনা করেছি, তার মাত্র ৩০ শতাংশও যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমি নিশ্চিত, দেশের মানুষ আমাকে সমর্থন দেবে।’

বিএনপি সর্বশেষ ক্ষমতায় ছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। ওই সময় টানা চার বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারেক রহমানসহ দলটির অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়। তারেক রহমান মনে করেন, তার বিরুদ্ধে করা এসব মামলা ছিল মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আওয়ামী লীগ সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘তারা কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি।’

জুলাই আন্দোলনের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের গুরুদায়িত্ব রয়েছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে, যেন মানুষের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত হয়।’

সাক্ষাৎকারে লন্ডনে কাটানো সময় নিয়েও স্মৃতিচারণা করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, লন্ডনে তার পছন্দের কাজ ছিল রিচমন্ড পার্কে ঘুরে বেড়ানো, চিন্তায় ডুবে থাকা কিংবা ইতিহাসের বই পড়া। তার প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’। তিনি বলেন, ‘আমি সম্ভবত আটবার সিনেমাটি দেখিছি।’

২০০৭ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চাঁদাবাজি, অর্থপাচার ও আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ নানা অভিযোগে ১৮ মাস জেল খাটেন তারেক রহমান। কারাবন্দি অবস্থায় তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০০৮ সালে তিনি যখন যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন, তখন কারণ হিসেবে তার চিকিৎসার কথা বলা হয়েছিল।

এসব ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, ‘শীতকালে খুব ঠাণ্ডা পড়লে এখনো পিঠে ব্যথা শুরু হয়। কিন্তু এটাকে আমি জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখি। আমি মনে করি, নিজের সর্বোচ্চটা আমাকে দিতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কাউকে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখে না পড়তে হয়।’

জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গেল বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। একই মাসে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধনও স্থগিত করা হয়। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়েছে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। সাক্ষাৎকারে এ বিষয়েও নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তারেক রহমান। তার মতে, ‘অপরাধ যেই করুক না কেন, দেশে আইন আছে, সেই আইনে তাকে শাস্তি পেতেই হবে।’

গত শুক্রবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচনই অবাধ বা সুষ্ঠু হতে পারে না।’

আওয়ামী লীগকে ভোটের বাইরে রাখার বিষয়ে তারেক রহমান বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আজ যদি আপনি একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেন, তাহলে আগামীকাল আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না—এর নিশ্চয়তা কোথায় পাব?’

বাংলাদেশি পণ্যে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে কারো কারো আশঙ্কা। এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, কীভাবে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে তিনি চিন্তা-ভাবনা করছেন। বোয়িং উড়োজাহাজ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামোর ক্রেতা হওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে যাওয়ার ইঙ্গিতও দেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন, আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অপরকে সহায়তাও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, ট্রাম্প খুবই যুক্তিবাদী একজন মানুষ।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS