নির্বাচনের মাত্র ১২ দিন আগে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি এবং নির্বাচনের ৬ দিন আগে জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্যদের পক্ষে বিবৃতিতে আনু মুহাম্মদ, ড. মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, ড. সামিনা লুৎফা নিত্রা, ডা. নাজমুস সাকিব, দিলীপ রায়, মাহতাব উদ্দীন আহমেদ, ফেরদৌস আরা রুমী, সজীব তানভীর, আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি, আকরাম খান, সীমা দত্ত, আফজাল হোসেন এবং ফারহানা শারমীন ইমু এ কথা জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনের মাত্র ১২ দিন আগে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি এবং নির্বাচনের ৬ দিন আগে জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবার জন্য গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা।
রুটিন কাজ ছাড়া নীতি নির্ধারণী কাজের কোনো এখতিয়ার বা যৌক্তিকতা এরকম সরকারের থাকে না। সব যুক্তি, তথ্য এবং জাতীয় স্বার্থ অগ্রাহ্য করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা দেওয়া ও যথাযথ আলোচনা ছাড়াই জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তির ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের এই তৎপরতায় অস্বচ্ছতা, গোপনীয়তা এবং তাড়াহুড়া খুবই সন্দেহজনক। আমরা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক এসব তৎপরতায় উদ্বিগ্ন এবং তার তীব্র নিন্দা জানাই।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশে আছে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সংসদের উভয় কক্ষে আলোচনা করতে হবে।এখন দেশে সংসদ নাই, কাদের সঙ্গে আলোচনা করে এরকম গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার? এত তাড়াহুড়া করে, রাজনৈতিক দল ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করে নির্বাচনের একদম আগমূহুর্তে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক এইসব দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরের তৎপরতা বিগত স্বৈরাচারী সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে এবং সংস্কার করার প্রতিশ্রুতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলো। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজেই সংস্কার মানছে না, বরং অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জারি রেখে জনগণকে দীর্ঘমেয়াদি গভীর সংকটে ফেলছে।
আমরা এও জানি যে, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টারমিনালের চুক্তির ব্যাপারে উচ্চ আদালতে দায়ের করা রিট এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
আদালতে রিটচলাকালীন চুক্তির বিষয়ে সরকার কীভাবে তৎপরতা অব্যাহত রাখে তাও প্রশ্ন।
অন্যদিকে জাপান বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে জানিয়েছে যে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া দেশগুলো জিএসপি সুবিধা পাবে। ফলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা এমনিতেই বাংলাদেশ পাবে। সে হিসেবে নির্বাচনের ৬ দিন আগে এই ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ। গত দেড় বছর ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বেচ্ছাচারীতার ধারাবাহিকতা হচ্ছে এই সিদ্ধান্তগুলো।
পাশাপাশি আমরা দেখছি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আয়ে বিপুল ঘাটতি ও পরিচালন ব্যয় ব্যাপক বৃদ্ধির প্রবণতার মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে আগামী সরকারের মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট প্রকল্পের উদ্যোগের আওতায় ঢাকার মন্ত্রীপাড়ায় ৭২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণে ৭৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এর আগে মন্ত্রীদের জন্য ৬০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব তীব্র সমালোচনার মুখে বাতিল হলেও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য ২২০টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে যে, ২০২৫ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য বেড়েছে, গত দেড় বছরে প্রায় কয়েক লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। জনগণের কর্মসংস্থান, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ না বাড়িয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে সরকারি পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে। এই সরকারের উচ্চব্যয়ের অপচয়মূলক বরাদ্দ এবং দেশের জন্য ক্ষতিকর আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের সন্দেহজনক তৎপরতা নতুন নির্বাচিত সরকারকেও বিপদে ফেলবে।
সরকারের এই ধরনের চুক্তি ও আর্থিক অপচয়মূলক বরাদ্দের জনবিরোধী তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
আমরা মনে করি, আসন্ন নির্বাচনে যেসব দল জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, তাদের কর্তব্য সরকারের এই ধরনের অগণতান্ত্রিক তৎপরতা বন্ধের দাবি তোলা। জনগণের দিক থেকেও অন্তর্বর্তী সরকারের এইসব স্বেচ্ছাচারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন।