সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা ৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। মাত্র ১২ দিনের মাথায় চলতি মাসের ২১ জানুয়ারি ফল প্রকাশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। ২৮ জানুয়ারি শুরু হচ্ছে মৌখিক পরীক্ষা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর এই বিশাল নিয়োগপ্রক্রিয়া মাত্র এক মাসে শেষ করার উদ্যোগকে চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন ‘রকেট গতি’। তাঁদের অভিযোগ, এত অল্প সময়ে এত বড় নিয়োগ সম্পন্ন করার পেছনে স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। অস্বাভাবিক দ্রুততার কারণে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও মনে করছেন তাঁরা।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তেই ১৪ হাজার ৩৮৫টি সহকারী শিক্ষক পদের এই নিয়োগ শেষ করতে চায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ বলছেন, নির্বাচনী ব্যস্ততার মধ্যে এমন স্পর্শকাতর নিয়োগের কার্যক্রম শেষ করার নজির খুব কমই আছে।
তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অধিদপ্তর বলছে, এটি অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া নয়। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এবারের নিয়োগ পরীক্ষায় বিধিমালায় আনা পরিবর্তন নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। আগে মৌখিক পরীক্ষায় ২০ নম্বর থাকলেও এবার তা কমিয়ে ১০ করা হয়েছে। ভাইভায় ‘পাস–ফেল’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে এবং একাডেমিক সার্টিফিকেটের জন্য কোনো নম্বর রাখা হয়নি।
মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড গঠন ও তা পরিচালনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসকদের (ডিসি)। তবে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও প্রচার–প্রচারণা শুরু হওয়ায় জেলা প্রশাসন বর্তমানে চরম ব্যস্ত সময় পার করছে। চাকরিপ্রার্থীদের প্রশ্ন, এই পরিস্থিতিতে হাজার হাজার প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা কতটা সুষ্ঠুভাবে নেওয়া সম্ভব।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার বিষয়ে এখনো তাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাননি। নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই ধরনের কথা জানান বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসন এখন অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছে। শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা পরিচালনা করতে হবে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে।
মাঠপর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাচনের সময়ে ডিসিরা সরাসরি যুক্ত না থাকলে বোর্ড পরিচালনায় চাপ বাড়বে। এতে ভুলত্রুটির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আবু নূর মো. শামসুজ্জামান, মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর
প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ: লিখিত পরীক্ষা থেকেই বিতর্ক—
৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই বিতর্কের মুখে পড়ে। চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষা শুরুর ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নপত্র বাইরে চলে যায়। দেশের বিভিন্ন জেলায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও প্রক্সি ব্যবহার ও কেন্দ্র কন্ট্র্যাক্টের অভিযোগে অন্তত ২০০ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
অনেক কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের কান থেকে অতি সূক্ষ্ম ব্লুটুথ ইয়ারফোন বের করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে চাকরিপ্রার্থীরা মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন।
এ ছাড়া এবারের নিয়োগ পরীক্ষায় বিধিমালায় আনা পরিবর্তন নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। আগে মৌখিক পরীক্ষায় ২০ নম্বর থাকলেও এবার তা কমিয়ে ১০ নম্বর করা হয়েছে। ভাইভায় ‘পাস–ফেল’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে এবং একাডেমিক সার্টিফিকেটের জন্য কোনো নম্বর রাখা হয়নি। চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে অনৈতিকভাবে কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ‘রকেট গতিতে’ নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্বাচনের আগে দ্রুত নিয়োগ শেষ করার মাধ্যমে কোনো বিশেষ সিন্ডিকেট ফায়দা লুটতে চাইছে কি না, সেই শঙ্কা তাঁদের মধ্যে কাজ করছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর অবশ্য শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, বর্তমানে দেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজার ৩৮৫টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদও ফাঁকা।
আবু নূর মো. শামসুজ্জামানের ভাষ্য, শিক্ষক–সংকটের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাই প্রয়োজনের নিরিখে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া নয়। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশেই পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসকদের ব্যস্ততার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনে এডিসি বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে বোর্ড পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৯ জানুয়ারির লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন মোট ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৮ পরীক্ষার্থী, যা মোট আবেদনকারীর প্রায় ৭৬ শতাংশ। এই বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর মধ্য থেকে শর্ত সাপেক্ষে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন ৬৯ হাজার ২৬৫ জন। জেলাভিত্তিক ফলে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা থেকে (২ হাজার ৮০৭ জন)। এরপরেই রয়েছে কুমিল্লা (২ হাজার ৫৬৪ জন), কুড়িগ্রাম (২ হাজার ৪৬০ জন), দিনাজপুর (২ হাজার ৪২১ জন) ও গাইবান্ধা (২ হাজার ২৯৫ জন)।
মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি ২৭ জানুয়ারির মধ্যে নিজ নিজ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে জমা দিতে হবে। জমাদানের সময় অবশ্যই প্রাপ্তি স্বীকারপত্র সংগ্রহ করতে হবে এবং মৌখিক পরীক্ষার দিন সব কাগজপত্রের মূল কপি সঙ্গে আনতে হবে।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জেলা পর্যায়ে এই মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থীদের নাগরিকত্ব সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, লিখিত পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিল জমা দিতে বলা হয়েছে।