‘…দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে, সম্ভবত তখনই মারা যায়’

‘…দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে, সম্ভবত তখনই মারা যায়’

জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. সাইদ হোসেন।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন তিনি।

এ মামলায় তাপস, নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুরের ঘটনায় ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়। এ মামলায় চারজন গ্রেপ্তার আছেন।তারা হলেন সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন ও যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী।

নানক-তাপসসহ পলাতক আসামিরা হলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশ সদর দপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সাবেক এডিসি রৌশানুল হক সৈকত।

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে রয়েছেন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক মো. তোফায়েল সিদ্দিক, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইসমাইল হোসেন, আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান-নূর-ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারেকুজ্জামান রাজীব, জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস (ব্যক্তিগত সহকারী) মো. মাসুদুর রহমান বিপ্লব, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইমান ওয়াসেক, ধানমন্ডি থানা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহাদ হোসেন সোহাগ, ঢাকা মহানগর উত্তর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সেন্টু ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম, আন্দোলনে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আক্রমণকারী মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জহির উদ্দিন আহম্মেদ, অস্ত্রধারী ‘হেলমেট বাহিনীর সদস্য’ মো. ইউনুছ এবং সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহমেদের সহযোগী মো. রুবেল হোসেন।

তাদের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলনকারী রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ, মো. মাহিন মিয়া ও মো. রনিকে হত্যা এবং পরদিন ১৯ জুলাই আল শাহরিয়ার হোসেন, মো. রাজু আহমেদ, মাহামুদুর রহমান সৈকত, মো. ইসমাইল, মো. জসিম উদ্দিন ও জোবায়েদ হোসেন ইমনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মঙ্গলবার জবানবন্দিতে মো. সাইদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকাল আনুমানিক সাড়ে ১১টার সময় ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রাপা প্লাজার সামনে জড়ো হই। আগের দিন আমাদের মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে উক্ত স্থানে জড়ো হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে গিয়ে দেখি, বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রী জড়ো হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। আমি তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগদান করি। আমরা আনুমানিক সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে থাকি। হঠাৎ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশ আমাদের ওপর অতর্কিতভাবে গুলি করে। আমরা আত্মরক্ষার্থে বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নেই। গুলি থামলে আমরা আবার রাস্তায় নেমে আসি। আবার গুলি ছোড়া হলে আমরা গলিতে গিয়ে অবস্থান নেই। এভাবে আনুমানিক তিন ঘণ্টা চলতে থাকে।

সাইদ আরও বলেন, বেলা আনুমানিক দুইটা-আড়াইটার দিকে আমার সামনে একটি ছেলে ঘুরে পড়ে যায়। আমিসহ আরও আন্দোলনকারী তাকে একটি গলিতে নিয়ে যাই। হাসপাতালে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আমি তাকে কোলে করে একটি রিকশায় উঠি। একটু সামনে গিয়ে কয়েকজন আন্দোলনকারীর সহযোগিতায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেই। আমি পুনরায় আন্দোলনে যোগ দেই। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ওই ছেলেটির নাম ফারহান ফাইয়াজ। সে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ছিল। সে মারা গেছে। সে গুলি খেয়ে মারা গেছে। ফারহানের বাবার কাছ থেকে শুনতে পেয়েছিলাম যে, ফারহানের বুকের বাম পাশে গুলি লেগেছিল। আমি ফারহানকে যখন রিকশায় উঠাই, তখন সে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে। সম্ভবত তখনই সে মারা যায়!

পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়া এবং পত্রপত্রিকার মাধ্যমে সাইদ হোসেন জানতে পারেন, শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানকদের নির্দেশনায় ডিএমপি কমিশনার হাবিব, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার এবং এডিসি রৌশানুল হক সৈকতদের সহায়তায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী এম এ সাত্তার, বজলুর রহমান, রানা, আদাবরের তুহিন, মোহাম্মদপুরের তুহিন, আসিফ আহমেদ, মাসুদ, ইসমাইল, বিচ্ছু জালাল, মোল্লা রুবেল, সাজ্জাদ, রাসেল, ফজলে রাব্বি, এপিএস বিপ্লব, ইউনুস, রাজিবসহ আরও অনেক সন্ত্রাসী ফারহান ফাইয়াজসহ আরও অনেক শহীদের মৃত্যুর জন্য দায়ী। ভিডিওতে দেখা গেছে যে, এরা প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS