বিশ্বকাপের ফাইনাল পরবর্তী মারামারির ঘটনা এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল শেষে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের পতাকা প্রদর্শনের জেরে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) ও দেশটির ফুটবলারদের ওপর কঠোর শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ফিফা।
তবে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সিদ্ধান্তকে ‘অতিরিক্ত’ ও ‘অতিরঞ্জিত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।বিশেষ করে লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও নাহুয়েল মলিনার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কমাতে আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
দি স্পোর্টস রেডিওর ‘কোমো তে ভা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এএফএর প্রধান আইনি উপদেষ্টা ও লিগ্যাল ম্যানেজার আন্দ্রেস পাতন উরিচ পুরো পরিস্থিতি তুলে ধরেন।তিনি বলেন, ‘শৃঙ্খলাবিধির ছয়টি মামলার রায় আমরা পেয়েছি। এই রায়গুলো আমাদের পছন্দ হয়নি।আমরা জানতাম কিছু শাস্তি আসবে, তবে মাত্রাটা এত বেশি হবে তা ভাবিনি। ফাইনালের ঘটনার জন্য রবার্তো আয়ালা, পারেদেস, মলিনা এবং থিয়াগো আলমাদার ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা এসেছে।তাদের কর্মকাণ্ডের তুলনায় পারেদেস, মলিনা ওায়ার ওপর দেওয়া শাস্তি মাত্রাতিরিক্ত। আমরা শাস্তির পূর্ণাঙ্গ কারণ দর্শানোর নথি চেয়ে আবেদন করব এবং এরপর উচ্চতর কমিটিতে আপিল করব।’
ফেডারেশনের ওপর আরোপিত শাস্তির বিষয়ে উরিচ আরও ব্যাখ্যা করে জানান, ‘দর্শকদের অসদাচরণ এবং কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য অবজেক্টিভ রেসপনসিবিলিটি আইনের আওতায় ফেডারেশনের ওপরও জরিমানা এসেছে। এটি মূলত ফকল্যান্ডের পতাকা প্রদর্শন, যা ফিফার দৃষ্টিতে ক্রীড়া ইভেন্টে অ-ক্রীড়াসুলভ প্রদর্শন, এবং টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বের পাঁচটি ম্যাচে সমর্থকদের বর্ণবাদী, সমকামী-বিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক স্লোগানের কারণে দেওয়া হয়েছে।’
এই অপরাধের জন্য এএফএকে ১ লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছে এবং পরবর্তী ছয় মাসের জন্য একই অঙ্কের আরেকটি জরিমানা স্থগিত রাখা হয়েছে। জরিমানার এই প্রথম ১ লাখ ডলার ফিফা অনুমোদিত বৈষম্যবিরোধী পরিকল্পনায় ব্যয় করতে হবে। এছাড়া অফিশিয়াল ম্যাচে স্টেডিয়ামের গ্যালারির একটি নির্দিষ্ট অংশ, বিশেষ করে গোলপোস্টের পেছনের অংশ, আংশিক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী এক বছরে একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটলে স্থগিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না, তবে আবার আইন ভঙ্গ করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হবে।
তবে গ্যালারি আংশিক বন্ধের নির্দেশ থাকলেও আসনগুলো সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকবে না বলে আশ্বস্ত করেন আইনজীবী উরিচ। তিনি বলেন, ‘ফিফা এই বন্ধ থাকা ৫০ শতাংশ আসন পরিবার, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন কমিউনিটি গ্রুপের জন্য উন্মুক্ত রাখার অনুমতি দেয়। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে আমরা এটি করেছিলাম, যেখানে জীবনে কখনো জাতীয় দলের খেলা না দেখা ৭ হাজার শিশু মাঠে এসে খেলা দেখেছিল। বৈষম্যের বিষয়ে ফিফা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। মাঠে অনুপযুক্ত স্লোগান যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা আমরা পুরোপুরি উপলব্ধি না করা পর্যন্ত এমন শাস্তি আসতেই থাকবে।’
পরবর্তীতে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস’কে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে উরিচ জানান, আলমাদার নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ নেই, তবে বাকিদের শাস্তি পুরোপুরি অন্যায্য। তিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘লিয়ান্দ্রোর নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে যদি ২০১৪ সালে প্রতিপক্ষকে কামড় দেওয়ার দায়ে লুইস সুয়ারেজের ৯ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কিংবা অতীতে নাৎসি প্রতীক দেখানোর কারণে এক ইউরোপীয় খেলোয়াড়ের ১০ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার তুলনা করা হয়, তবে দেখা যাবে সেগুলোর অপরাধ অনেক বেশি গুরুতর ছিল। কিন্তু পারেদেসদের প্রায় একই ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিটি ভিডিও ফ্রেম ধরে ধরে বিশ্লেষণ করেছি এবং আমাদের বিশ্বাস এই শাস্তি অনেক কম হওয়া উচিত ছিল।’
উরিচ নিশ্চিত করেছেন, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রীতি ম্যাচে নয়, অফিশিয়াল প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেই কার্যকর হবে। এছাড়া অতীতে লিওনেল মেসির একটি উদাহরণ তাদের পক্ষে আইনি নজির হিসেবে কাজ করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উরিচ বলেন, ‘২০১৮ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে লাইন্সম্যানকে কটূক্তির দায়ে মেসিকে ৪ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আপিল কমিটি সেটি বিবেচনা করে শাস্তি পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনে। আপিল ট্রাইব্যুনালে এমন অনেক নজির রয়েছে যেখানে শাস্তি কমানো হয়েছে। বিশেষ করে মলিনা ও পারেদেসের মতো দীর্ঘ মেয়াদে নিষিদ্ধ খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে আমরা ইতিবাচক ফল আশা করছি।’
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে এএফএর এই আইনি উপদেষ্টা বলেন, ‘ফিফার রায়ের লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য আমাদের হাতে দশ দিন সময় রয়েছে, যা আমরা সোমবারের মধ্যেই সম্পন্ন করব। এরপর সকল প্রমাণাদি উপস্থাপন করে আপিল দাখিলের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তখন ফিফার আপিল কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে, তারা এই শাস্তি বহাল রাখতে পারে অথবা কমিয়ে দিতে পারে। তবে আপিল কমিশনও যদি এই রায় বহাল রাখে, তবে আমরা সুইজারল্যান্ডের সর্বোচ্চ ক্রীড়া আদালত ‘কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট’ (সিএএস)-এ যাওয়ার কথা বিবেচনা করব।’