নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের আশায় রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিলেন অনেক নারী। কারও গন্তব্য অফিস, কারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কেউবা ফিরবেন বাড়িতে।কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল-অপেক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত গোলাপি বাসের দেখা মেলেনি। বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ডে সকাল ১০টার দিকে একটি পিংক বাস দেখা গেলেও এরপর বিকেল ৩টা পর্যন্ত আর কোনো বাসের দেখা মেলেনি।ফলে নিরাপদ যাতায়াতের আশায় আসা অনেক নারীকে শেষ পর্যন্ত প্রচলিত গণপরিবহনের ওপরই ভরসা করতে হয়েছে।
কর্মজীবী নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে আবারও পৃথক ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)।নারী চালক ও কন্ডাক্টর দিয়ে পরিচালিত গোলাপি রঙের এসব বাস প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি রুটে ১৪টি বাস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস চলাচলের কথা।
তবে উদ্বোধনের পর প্রথম দিনেই বিভিন্ন রুটে বাসের দেখা না পাওয়া, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং পর্যাপ্ত বাস না থাকার অভিযোগ করেছেন নারী যাত্রীরা। তারা জানান, উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়; কিন্তু নিয়মিত ও পর্যাপ্ত বাস না চললে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
সরেজমিনে বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, কয়েকজন নারী পিংক বাসের অপেক্ষায় রয়েছেন। সকাল ১০টার দিকে সেখানে একটি গোলাপি রঙের বাস আসে। বাসটিতে যাত্রী ছিলেন মাত্র পাঁচ-ছয়জন। এরপর দীর্ঘ সময় আর কোনো বাসের দেখা মেলেনি।

বাসস্ট্যান্ডের পাশের সিঙ্গারা বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, ‘সকালে একটা গোলাপি বাস দেখছি। বাসে পাঁচ-ছয়জন যাত্রী ছিল। পরে আর কোনো বাস দেখিনি। তবে অনেক নারী এসে আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, গোলাপি বাস কখন আসবে।’
চা বিক্রেতা নূর হোসেন বলেন, ‘সকালে একটা দেখছিলাম। দোতলা বাস। কিন্তু যাত্রী বেশি ছিল না। পরে অনেকেই আইসা জিজ্ঞাসা করছে, গাড়ি আইছে কি না।’
দক্ষিণখানের বাসিন্দা স্বপ্না আক্তারের গন্তব্য বিজয়নগর পানির ট্যাংকি এলাকা। পিংক বাসের আশায় বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাস না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন।
স্বপ্না বলেন, ‘নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সরকার পিংক বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, এটা অবশ্যই ভালো খবর। কিন্তু প্রথম দিনেই যদি বাস না পাই, তাহলে আমরা এই সেবা কীভাবে পাব?’
তার মতো আরও কয়েকজন নারীকে বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কারও হাতে অফিসের ব্যাগ, কেউ সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানোর চিন্তায় ব্যস্ত।
সময় গড়িয়ে দুপুর, এরপর বিকেল ৩টা কিন্তু নির্ধারিত রুটে আর কোনো গোলাপি বাসের দেখা নেই। দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত অন্য গণপরিবহন বেছে নেন।
দিন দিন রাজধানীতে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েরাও প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করছেন। কিন্তু গণপরিবহনে তাদের অভিজ্ঞতা সবসময় স্বস্তিদায়ক নয়।
ভিড়ের মধ্যে ওঠানামা, আসন নিয়ে বিড়ম্বনা, পুরুষ যাত্রীর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি, অশোভন আচরণ কিংবা হয়রানির আশঙ্কা-এসব কারণে অনেক নারী প্রতিদিনের যাতায়াতেই বাড়তি মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন।
এমন বাস্তবতায় শুধু নারীদের জন্য বাস চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। তবে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত বাস না থাকায় প্রথম দিনেই সেই প্রত্যাশায় কিছুটা ভাটা পড়েছে।
এদিন তপ্ত দুপুরে মেরুল-বাড্ডা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সুমাইয়া রহমান। পিংক বাস চালুর খবর শুনে তিনিও আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাসের দেখা পাননি।
সুমাইয়া বলেন, ‘এই রুটে কোনো গাড়িই দেখছি না। পিংক বাস চালু হচ্ছে শুনে ভেবেছিলাম, নারীদের যাতায়াতটা একটু স্বস্তির হবে। খবরটা শুনে স্বস্তি পেয়েছিলাম। এখন গাড়ি না দেখে হতাশ লাগছে।’
শুধু বিমানবন্দর কিংবা গাজীপুর রুট নয়, নতুনবাজার থেকে মতিঝিলগামী নারী যাত্রীদের মধ্যেও পিংক বাস নিয়ে আগ্রহ ছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বাস না পাওয়ায় তাদেরও শেষ পর্যন্ত অন্য গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
দিনভর বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে অবশেষে দেখা মিলল একটি পিংক বাসের। কাওরান বাজার থেকে মতিঝিলমুখী ওই বাসে চালকের আসনে ছিলেন একজন নারী। যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তার কাঁধে।
তবে এই বাসের চালক ও নারী কর্মীদের কর্মপরিবেশের চিত্রও নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। বাসটির হেলপার জানান, সকাল ৭টার দিকে কর্মস্থলে বের হয়ে দীর্ঘ সময় সড়কে থাকতে হয় তাদের। যানজটের কারণে এক ট্রিপ শেষ করতেই অনেক সময় দুপুর গড়িয়ে যায়। এরপর আবার যাত্রী নিয়ে ফিরতে হয়।
বাসের হেলপার ও ওই নারী কর্মী জানান, সকাল থেকে রাস্তায় থাকতে হয়। যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। একবার গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আবার যাত্রী নিয়ে ফিরতে হয়।
দেখা যায়, এই গরমের মধ্যেই বোরকা-হিজাব পরে বাস চালাতে ও যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া সংগ্রহ করতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকা এসব কর্মীর জন্য পর্যাপ্ত পানি, খাবার, বিশ্রাম এবং নিরাপদ ওয়াশরুমের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
বাসের যাত্রী আলফা বলেন, নারীদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করার উদ্যোগ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই পরিবহনে কর্মরত নারী চালক ও কর্মীদের জন্যও নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে দীর্ঘ রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর জন্য নির্দিষ্ট বিরতি, বিশ্রামকক্ষ ও ওয়াশরুমের ব্যবস্থা না থাকলে নারী কর্মীদের জন্য এ কাজ শারীরিক ও মানসিকভাবে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতেই পিংক বাস চালুর উদ্যোগ। তাই উদ্যোগটি শুধু উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করার দাবি যাত্রীদের।
তাদের প্রত্যাশা, পর্যাপ্তসংখ্যক বাস, নির্দিষ্ট সময়সূচি, নিয়মিত চলাচল, নির্ধারিত স্টপেজের পাশাপাশি নারী চালক ও কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, খাবার, পানি এবং নিরাপদ ওয়াশরুমের ব্যবস্থা থাকবে।
কারণ নিরাপদ যাতায়াতের জন্য শুধু গোলাপি রঙের বাস রাস্তায় নামানোই যথেষ্ট নয়। যে নারী সকালবেলা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাঁর অপেক্ষার সময়টুকুও নিরাপদ হতে হবে। আর যে নারী সারাদিন সেই বাস চালিয়ে অন্য নারীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন, তাঁর নিজের কর্মপরিবেশও হতে হবে নিরাপদ ও মানবিক।
নারীর নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি রুটে ১৪টি বাস চলবে। ঢাকার ১০টি রুটে ১০টি বাসের মধ্যে একটি একতলা এবং নয়টি দ্বিতল বাস। চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি বাস চলাচল করবে।
এই সেবার আওতায় ঢাকা মহানগরীর ১০৬টি, চট্টগ্রামের ১২টি এবং বগুড়ার ১৩টি—মোট ১৩৪টি স্টপেজে নারী যাত্রীদের পরিবহনসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকায় নতুনবাজার (কোকাকোলা)-মতিঝিল, তালতলা-মতিঝিল, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-জিপিও, মিরপুর-১০-মতিঝিল, মিরপুর-মতিঝিল, মিরপুর-১২-মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল, আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল এবং গাজীপুর-বিমানবন্দর রুটে বাস চলাচলের কথা রয়েছে।
নতুনবাজার থেকে মতিঝিল রুটে কোকাকোলা, নতুনবাজার, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত বিভিন্ন স্টপেজ রাখা হয়েছে। আর আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল রুটে বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বিশ্বরোড, কুর্মিটোলা, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, মৎস্যভবন, প্রেসক্লাব, গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
গাজীপুর-বিমানবন্দর রুটে গাজীপুর শিববাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা, আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস চলবে।
নারী যাত্রীদের জন্য সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা বাস, ডিপো ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের পাশাপাশি ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করেছে বিআরটিসি। বিআরটিসি ও ‘সহজ’-এর মধ্যে সমঝোতার আওতায় এই ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি বাসে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) এবং একটি বাসে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু করা হয়েছে। প্রতিটি বাসে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সংযোজন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব প্রযুক্তি সব বাসে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।