খালেদা জিয়া: গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী-প্রধানমন্ত্রী

খালেদা জিয়া: গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী-প্রধানমন্ত্রী

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি ‘আপসহীন’ নেত্রীর উপাধি পেয়েছিলেন।

শনিবার (১৫ আগস্ট) শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী। গত ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর পর এবারই প্রথম আজ আপসহীন এই নেত্রীকে স্মরণ করছে বাংলাদেশ।

জন্ম, শৈশব ও দাম্পত্য জীবন
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার।১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তারা দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তার শিক্ষাজীবন কাটে।১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাদের দুই সন্তান—বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন রাজনীতিতে বেগম জিয়ার কোনো উপস্থিতি ছিল না। মূলত দুই পুত্রকে লালন-পালন ও গৃহকর্মেই সময় কাটাতেন তিনি।

এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্বামীর মৃত্যুতে এক সাধারণ গৃহবধূর জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।

রাজনীতিতে আগমন ও আপসহীন নেতৃত্ব
প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর দল যখন চরম কোন্দল ও এরশাদের সামরিক শাসনে বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই নেতা-কর্মীদের অনুরোধে ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন বেগম জিয়া।

১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সাত দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। একাধিকবার গৃহবন্দি ও নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি আপস করেননি। দীর্ঘ ৯ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তার অবিস্মরণীয় নেতৃত্বে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বেগম খালেদা জিয়া। তার মেয়াদেই দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মোট তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। নারী শিক্ষা, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সংস্কারে তার অবদান স্মরণীয়।

ওয়ান-ইলেভেন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক হয়রানি
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে ৩ সেপ্টেম্বর বেগম জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। চরম নির্যাতন চালানো হয় জিয়া পরিবারের ওপর। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন এই নেত্রী। ২০১০ সালে তাকে সেনানিবাসের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ফরমায়েশি মামলায় সাজা দিয়ে তাকে পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করা হয়। সেখানে কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন তিনি।

চব্বিশের অভ্যুত্থান, মুক্তি ও চিরবিদায়
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সৃষ্ট ছাত্র-জনতার প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। দীর্ঘদিনের বন্দিদশা ও শর্তসাপেক্ষ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পান গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

এরপর দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত বছর (২০২৫ সাল) ৩০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন তিনি। তার জানাজায় অংশ নেন লাখ লাখ মানুষ, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয়।

আজ তার ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে দেশবাসী গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেই নেত্রীকে, যিনি আজীবন এদেশের মাটি ও মানুষের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS