ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় গত মাসে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গোপনে বিমান বদল করেছিলেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। এ জন্য বেশ জটিল একটি কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা গেলেও পরে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের সহায়তায় তাকে সামরিক বাহিনীর একটি ছোট বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিমানে থাকা সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তাও জানতেন না যে প্রেসিডেন্টকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়েন্দারা এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি শনাক্ত করেছিলেন যে ইরান ট্রাম্পের বিমান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস এখনো গোপনে বিমান বদলের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
এর আগে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের কাছে তিনিই ‘নম্বর ওয়ান টার্গেট’।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আবারও সামরিক হামলা শুরু করার এক দিন পর এই গোপন তৎপরতা চালানো হয়।
তুরস্কে যাওয়ার সময় ট্রাম্প কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে চড়েছিলেন। তবে ফেরার সময় তিনি ‘পুরোনো দিনের কথা মনে করে’ পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই ফিরবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
৮ জুলাইয়ের ভিডিও ফুটেজে আঙ্কারা বিমানবন্দরে তাকে প্রেসিডেন্টের বিমানে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপর তাকে গোপনে একটি ছোট সি-৩২এ সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানটি একটি পরিবর্তিত বোয়িং ৭৫৭, যা সাধারণত ভাইস প্রেসিডেন্টের যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে পাশ দিয়ে ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠেছিলেন, তার বিপরীত পাশে একটি ক্যাটারিং ট্রাককে বিমানের দরজার সমান উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই ট্রাকের মাধ্যমে ট্রাম্পকে গোপনে সি-৩২এ বিমানে নেওয়া হয়।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও আলাদাভাবে বাইরের সিঁড়ি ব্যবহার করে সি-৩২এ বিমানে ওঠেন, যাতে পুরো যাত্রাটিকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়।
এদিকে সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন এবং তাদের জানালা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তারা জানতেন না যে প্রেসিডেন্ট আর ওই বিমানে নেই।
বিমানে থাকা একজন সাংবাদিক দলের প্রযোজক জানান, তুরস্ক থেকে যাত্রার সময় অস্বাভাবিক একটি বিষয় ছিল সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশ। একজন ফটোগ্রাফার সাময়িকভাবে পর্দা সরালে তাকে দ্রুত তা আবার বন্ধ করতে বলা হয়। তাকে জানানো হয়, এটি প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিক্রেট সার্ভিসের অনুরোধ।
মঙ্গলবার প্রকাশিত হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদনে ওই প্রযোজক আরও জানান, সাংবাদিকেরা বিমানে পৌঁছানোর সময় সামনে ও পেছনে দুটি ক্যাটারিং ট্রাক দেখা যায়। বিমানবন্দরে গাড়িবহরের অনেক পেছনে থাকায় সাংবাদিকদের গাড়িটি ট্রাম্পের বিমানে ওঠার ছবি তোলার অবস্থানেও পৌঁছাতে পারেনি।
প্রযুক্তিগতভাবে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ কোনো নির্দিষ্ট বিমানের নাম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যে বিমানে থাকেন, সেটিই ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ কলসাইন ব্যবহার করে। তবে ওই ঘটনায় ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ ‘রিচ ১৮’ কলসাইন ব্যবহার করে। সাংবাদিকদের বহনকারী বিমানটি আগের মতো ‘এএফ১’ কলসাইন ব্যবহার করতে থাকে, যাতে পুরো বিষয়টি গোপন রাখা যায়।
এরপর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে আবার ওঠেন। আরএএফ মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে বিমানটি অবতরণের পর তাকে সেখান থেকে নামতে দেখা যায়। তবে সি-৩২এ থেকে কীভাবে তাকে আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।
এরপর ট্রাম্প কাতারের দেওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন এবং সেটিতে করে ওয়াশিংটনে ফেরেন।
ওই বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইরানের হুমকির কথা উল্লেখ করলেও এর আগে গোপনে বিমান বদলের বিষয়টি জানাননি।
তুরস্ক থেকে ফেরার সময় সাংবাদিকদের কেন জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘কারণ আপনারা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে আছেন, যাদের আমরা মোকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছি তারা নোংরা লোক’।
তিনি বলেন, তার জীবনের ওপর ‘সব সময়ই হুমকি’ রয়েছে এবং ইরানের তালিকায় তিনি ‘এক নম্বর’।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের আরও বলেন, ‘কিন্তু আমি যদি যাই, আপনারাও যাবেন, তাই না?’ এরপর তিনি বলেন, ‘হয়তো কোনো একদিন আপনারা পেশা বদলাতে চাইবেন’।
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিউং প্রতিবেদনগুলো সরাসরি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেননি। তবে তিনি বলেন, নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান একটি ‘অত্যাধুনিক বিমান’, যাতে প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মীদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।