বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির ঘোষণা দেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে পড়ে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
গত মঙ্গলবার নতুন এই বিনিয়োগ প্রকল্পের কথা তিনি প্রকাশ করলেও, সিদ্ধান্ত বাতিলের আগ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ফুটবল পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল নজিরবিহীন।শুক্রবার গভীর রাতে ইনফান্তিনো এই বিতর্কিত স্কিম পুরোপুরি বাতিলের ঘোষণা দিলেও ফুটবলের সর্বোচ্চ কর্তার ওপর থেকে ক্ষোভ কমেনি। বরং এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রভাবশালী ফুটবল সংস্থা সরাসরি ইনফান্তিনোর ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছে এবং ফিফার অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে।
সিদ্ধান্ত বাতিলের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা উয়েফা জানিয়েছে, ‘আমরা ফিফার বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্ব ব্যক্তিগত খাতে বিক্রির পরিকল্পনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছি। তবে ফিফার বর্তমান নেতৃত্ব কেবল উয়েফার আস্থাই হারায়নি, বরং পুরো ফুটবল পরিবারের আরও অনেক সদস্যের আস্থা হারিয়েছে।’
তারা আরও জানায়, ‘বিদ্যমান ফিফা ফরোয়ার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে সঠিক সম্পদ বণ্টনের ব্যবস্থা করতে উয়েফা অংশীদারদের সঙ্গে অবিলম্বে কাজ শুরু করবে। এটি পুরো ফুটবলের জন্য একটি জয়, তবে এখানেই শেষ নয়।ফিফায় বিশ্বাস পুনর্গঠনের কাজটি কেবল শুরু হলো।’
একইভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ডাচ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (কেএনভিবি)। সংস্থাটি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছে, ‘প্রস্তাব প্রত্যাহারের মাধ্যমে এই বিষয়ের নিষ্পত্তি ঘটেনি। যেভাবে প্রক্রিয়াটি চালানো হয়েছে, তা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি মৌলিক আস্থার জায়গা ভেঙে দিয়েছে। কেএনভিবি তার নেতৃত্বে আর আস্থা রাখে না।’
ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)-ও উয়েফার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জানিয়েছে, ‘আমরা ইউরোপীয় সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমরা ফিফার এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করি; ফিফা বিশ্বকাপ সব সময়ই ফুটবলের ছিল এবং থাকবে।’
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা ফিফার একলা চলার নীতির সমালোচনা করে বলেন, ‘বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ সবসময় উন্মুক্ত আলোচনা ও আমাদের খেলার প্রতিষ্ঠিত শাসন কাঠামোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।’
এ ছাড়া সুইডিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সাইমন অ্যাস্ট্রম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, অস্পষ্ট প্রক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া থেকেই এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ছিল, তবে ফিফার স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক ঘাটতি নিয়ে এখনও তারা চিন্তিত।
বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ড চেয়ারম্যান প্যাসকেল ভ্যান ডামে আন্তর্জাতিক ফুটবলের একটি স্বাধীন ও টেকসই কাঠামোর প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে ফুটবল অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান অ্যান্টনি আইজ্যাক ফুটবলের উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে সমর্থন জানিয়ে মনে করিয়ে দেন, ‘কিছু নীতি কখনোই পরিবর্তন হওয়া উচিত নয়। সততা, স্বাধীনতা, ভালো শাসনব্যবস্থা ও স্বচ্ছতা অগ্রগতির বাধা নয়, বরং এগুলোর মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি সম্ভব হয়।’
সব মিলিয়ে, সিদ্ধান্ত বাতিল করলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষ সংস্থাগুলোর এমন তীব্র অনাস্থা ও বার্তায় নিজের ক্ষমতাকালে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ধাক্কা খেলেন ইনফান্তিনো।