ফরিদপুরে মরিচের বাজারে আগুন

ফরিদপুরে মরিচের বাজারে আগুন

টানা ভারী বৃষ্টিতে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার গ্রীষ্মকালীন মরিচ চাষে নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা অতি বৃষ্টিতে অধিকাংশ মরিচক্ষেতে পানি জমে গাছ পচে ও মারা যাওয়ায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন হাজারো কৃষক।মাঠে উৎপাদন হঠাৎ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। বর্তমানে ফরিদপুরের বিভিন্ন বাজারে জাতভেদে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ২৮০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সরেজমিনে মধুখালীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, কয়েকদিন আগেও সবুজ মরিচে ভরা যে মাঠগুলো ছিল, সেগুলো এখন পানিতে ডুবে আছে। জমে থাকা পানির কারণে মরিচগাছের শিকড় পচে গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।অনেক কৃষক ক্ষতির পরিমাণ দেখে বাধ্য হয়ে পুরো ক্ষেত পরিষ্কার করে ফেলছেন। কোথাও কোথাও জমিতে নতুন করে চাষের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।

উপজেলার রায়পুর, জাহাপুর ও মেগচামী ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। তাদের দাবি, উপজেলার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মরিচের ক্ষেত বৃষ্টির কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে অনেক কৃষক ঋণ ও ধারদেনার বোঝা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

রায়পুর ইউনিয়নের কৃষক রোকনউজ্জামান ও ফিরোজ মিয়া জানান, চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের আশা নিয়ে তারা জমিতে মরিচের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে প্রায় সব গাছই মারা গেছে। এখন ক্ষেত তুলে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তারা বলেন, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের ব্যয় আগেই অনেক বেড়েছিল। এর মধ্যে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগের টাকাও ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সরকারি সহায়তা পেলে আবার নতুন করে চাষ শুরু করা সম্ভব হবে।

মধুখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মাহবুব এলাহী জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন মরিচের আবাদ হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে অধিকাংশ জমিতে পানি জমে গাছ পচে মারা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কিছু কৃষককে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে আরও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ফরিদপুর জেলায় ৩ হাজার ১১২ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে ৫ হাজার ৭০৬ মেট্রিক টন মরিচ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে টানা বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

উৎপাদন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। ফরিদপুর শহরের হাজী শরিয়তুল্লাহ বাজার, চকবাজার, টেপাখোলা বাজার ও হেলিপ্যাড বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কাঁচা মরিচের সরবরাহ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মরিচ ২৮০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাইরে থেকে পর্যাপ্ত মরিচ আসছে না। যে পরিমাণ মরিচ বাজারে আসছে, তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় দাম বাড়ছে।

ফরিদপুর জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি মানিক মজুমদার বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মরিচের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি ভোক্তাদেরও বাড়তি দামে মরিচ কিনতে হচ্ছে। তিনি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

একইসঙ্গে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS