সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) চার দশকের বেশি সময়ের কার্যক্রমের পর এবার বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা।
মূলধন ঘাটতির কারণে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই) জনতা ব্যাংকের কার্যক্রমে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বলে জানা গেছে।ঘাটতি পূরণ না হলে বিদ্যমান কার্যক্রম ধাপে ধাপে গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে এরই মধ্যে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সিবিইউএইর বিধিমালা অনুযায়ী, ইউএইতে পরিচালিত জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ৪০ কোটি দিরহাম হতে হবে।
বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন রয়েছে ১০ কোটি দিরহাম। ফলে ৩০ কোটি দিরহাম বা প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে (প্রতি দিরহাম ৩৩.৫০ টাকা ধরে)।
এই ঘাটতির কারণে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, নতুন গ্রাহক হিসাব খোলা স্থগিত করতে বলেছে এবং বিদ্যমান কার্যক্রম ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে।
জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ইউএইর ব্যাংকিং বিধিমালায় নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধন বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া এবং বাংলাদেশে ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কারণেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত ৮ জুলাই সিবিইউএইর সহকারী গভর্নর আহমেদ সাঈদ আল কামজি জনতা ব্যাংকের ইউএই অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে চিঠি দিয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে বিষয়টি জানানো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাতে নির্দেশ দেন।
পরের দিন ৯ জুলাই ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সিদ্ধান্তের বিষয়টি জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অফ-সাইট সুপারভিশন বিভাগকেও অবহিত করে।
১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সমন্বয়ে জরুরি বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী, একই দিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে জরুরি বৈঠক আয়োজনের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন মো. মজিবর রহমান।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১৬ সাল থেকে ইউএই শাখাগুলোর অর্জিত সব মুনাফা দেশটিতেই রেখে তা পরিশোধিত মূলধনে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে মূলধন ৭ কোটি ৫০ লাখ দিরহাম থেকে বেড়ে ১০ কোটি দিরহামে উন্নীত হয়েছে।
তিন বছরে ধাপে ধাপে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর একটি প্রস্তাব ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দিয়েছে জনতা ব্যাংক। এই প্রস্তাব গ্রহণ না করলে সরকারি সহায়তায় মূলধন বাড়ানোর চেষ্টা করবে ব্যাংকটি।
সিবিইউএই তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে, জনতা ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি এবং ন্যূনতম মূলধন সংক্রান্ত শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণেই নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, আমানতকারীদের দাবির অর্থ পরিশোধের জন্য সীমিত পরিসরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নতুন গ্রাহক গ্রহণ স্থগিত করে বিদ্যমান দায়-দেনা ও ব্যবসা নিষ্পত্তির দিকে মনোযোগ দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে, গত ২২ এপ্রিলের আরেকটি চিঠিতে সিবিইউএইর আহমেদ সাঈদ আল কামজি জনতা ব্যাংকের ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর উল্লেখ করে জানান, ইউএইর বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান কার্যালয়েরও ন্যূনতম ২০০ কোটি দিরহামের সমপরিমাণ মূলধন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেখানেও ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৫০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৭৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
জনতা ব্যাংক ১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে ১ কোটি ২৭ লাখ দিরহাম পরিশোধিত মূলধন নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ এবং আল আইন—এই চারটি শহরে ব্যাংকটির শাখা রয়েছে।
এসব শাখা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স সেবা, নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশিদের ব্যাংকিং সুবিধা, আমদানি-রপ্তানি ঋণপত্র (এলসি), ট্রেড ফাইন্যান্স, ব্যাংক গ্যারান্টি, আমানত গ্রহণ এবং বাণিজ্যিক ঋণসেবা প্রদান করে থাকে।
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত ইউএই কার্যক্রম থেকে ৩ কোটি ২০ লাখ দিরহাম মুনাফা অর্জিত হয়, যার মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ দিরহাম পরিশোধিত মূলধনে যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার প্রয়োজনীয় মূলধন জোগান দিতে না পারলে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি মেনে শাখাগুলো বন্ধ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিশোধিত মূলধন, আমানত এবং অন্যান্য দায়-দেনার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
জনতা ব্যাংকের এমডি মো. মজিবর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, আমরা বিষয়টির সমাধানের জন্য কাজ করছি। দুই এক দিনের মধ্যেই এর অগ্রগতি সম্পর্কে আমারা জানাতে পারবো।