সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুলকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল থেকে বহিস্কার করায় তার এমপি পদটি শূন্য হওয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানিয়ে জামায়াত চিঠি দিলেই তার পদ শূন্য হবে কি-না, সে বিষয়টিও সামনে এসেছে।তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংবিধান কিংবা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এ নিয়ে সরাসরি কোনো বিধান নেই। এক্ষেত্রে সংসদ সদস্যপদ বিরোধ নিষ্পত্তি আইন-১৯৮০ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, সংবিধানের ৬৬, ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো এমপিকে তার দল থেকে বহিস্কার করা হলে কী হবে তা উল্লেখ নেই।সেখানে বলা হয়েছে, নিজে পদত্যাগ করলেই কেবল পদ শূন্য হবে। এক্ষেত্রে গাজী নজরুলকে বহিস্কার করা হয়েছে।তাই সংসদ সদস্য পদ বিরোধী নিষ্পত্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।
কোনো দল কোনো তার এমপিকে দল থেকে বহিস্কার করার পর নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিলেও কমিশন বিরোধ নিষ্পত্তি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে না। কেননা, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনে স্পিকারকে চিঠি দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীকে স্পিকারের কাছে বিরোধটি উত্থাপন করতে হবে।
বিরোধ নিষ্পত্তি আইনে যা বলা আছে
আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার পর স্পিকার ত্রিশ দিনের মধ্যে একটি বিবৃতি প্রস্তুত করবেন, যাতে বিরোধ-সংক্রান্ত তথ্যাবলি, যে সংসদ সদস্যকে বা যার সংসদীয় আসনকে কেন্দ্র করে বিরোধের উদ্ভব হয়েছে তার নাম ও ঠিকানা, এবং যে ব্যক্তি বিরোধ উত্থাপন করেছেন তার নাম ও ঠিকানা উল্লেখ থাকবে। পরবর্তীতে এদের সম্মিলিতভাবে ‘বিরোধের পক্ষসমূহ’ (parties to the dispute) হিসেবে উল্লেখ করা হবে। স্পিকার উক্ত বিবৃতিটি, বিরোধটি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরণ করবেন।
আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, স্পিকার কর্তৃক কোনো বিরোধ শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হলে, নির্বাচন কমিশনের অভিমত যদি এই না হয় যে, বিরোধ-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে স্পিকারের নিকট একটি রেফারেন্স করা প্রয়োজন, তবে কমিশন ধারা ৩-এ উল্লিখিত বিবৃতিটি প্রাপ্তির তারিখ হতে চৌদ্দ দিনের মধ্যে উক্ত বিবৃতির একটি অনুলিপি বিরোধের পক্ষসমূহের নিকট প্রেরণ করবে এবং কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিরোধ সম্পর্কে তাদের লিখিত বক্তব্য, যদি থাকে, দাখিল করার জন্য তাদেরকে অনুরোধ করবে। লিখিত বক্তব্য দাখিলের জন্য নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর, নির্বাচন কমিশন তার নির্ধারিত তারিখে এবং নির্ধারিত সময় ও স্থানে বিরোধটির শুনানি করবে। বিরোধের সকল পক্ষের নির্বাচন কমিশনের সম্মুখে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হওয়ার অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব লাভ করার অধিকার থাকবে। নির্বাচন কমিশন বিরোধের পক্ষসমূহকে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং সাক্ষীদের জেরা করার যুক্তিসঙ্গত সুযোগ প্রদান করবে।
এ ছাড়া উপর্যুক্ত বিধানসমূহ ব্যতীত, কোনো বিরোধের শুনানির কার্যপ্রণালী মামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন যে রূপ উপযুক্ত মনে করবে, সে রূপ হবে।
এদিকে আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী, কোনো বিরোধের শুনানি ও নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে, নির্বাচন কমিশন, কোড অব সিভিল প্রসিডিউর-১৯০৮ এর অধীনে কোনো মোকদ্দমার বিচারকালে একটি দেওয়ানি আদালতের যে সকল ক্ষমতা থাকে, তার অধিকারী হবে। এক্ষেত্রে যে কোনো ব্যক্তিকে সমন জারি করা, তার উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং তাকে শপথপূর্বক পরীক্ষা করা; কোনো দলিলের অনুসন্ধান ও উপস্থাপন দাবি করা; হলফনামার মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ করা; সাক্ষী বা দলিল পরীক্ষা করার জন্য কমিশন জারি করা এবং বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য বিষয়ে ক্ষমতার অধিকারী হবে। এ ছাড়া এই আইনের অধীনে নির্বাচন কমিশনের সম্মুখে পরিচালিত যে কোনো কার্যধারা, পেনাল কোডের ১৯৩ ধারা মোতাকেব একটি বিচারিক কার্যধারা বলে গণ্য হবে।
নির্বাচন কমিশন আইনে ৬ ধারা অনুযায়ী, স্পিকারের চিঠি পাওয়ার তারিখ থেকে একশত বিশ দিনের মধ্যে কোনো বিরোধের বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত স্পিকারের নিকট প্রেরণ করবে। এক্ষেত্রে কমিশন এমপি পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত দিলে সংসদ সচিবালয় সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এমপির পদ শূন্য ঘোষণা করবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশন পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবে সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- কোনো সংসদ-সদস্য তাঁর নির্বাচনের পর এই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত অযোগ্যতার অধীন হইয়াছেন কি না কিংবা এই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানী ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে। ২- অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। আর ৭০ অনুচ্ছেদ কেউ পদত্যাগ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, বহিস্কারের বিষয়টি নেই। এক্ষেত্রে আইনের ভাবধারা (স্পিরিট) বিবেচনায় নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির এখতিয়ার কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।
জানাগেছে, অতীতেও এই ধরণের ক্ষেত্রে আইনটি বলেই নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিয়েছিল। ২০০০ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচিত কিশোরগঞ্জ-২ আসনের তৎকালীন এমপি মো. আখতারুজ্জামানকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছিলো। এরপর তার এমপি পদ শূন্য ঘোষণার জন্য স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে অনুরোধ করেছিলো তৎকালীন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। তখন সিইসিকে সিদ্ধান্ত দিতে বলেছিলেন স্পিকার। এরপর শুনানি করেই আখতারুজ্জামানের সংসদ সদস্য পদ শূন্য ঘোষণা করার রায় দিয়েছিলো ইসি।
এদিকে এই আইনের অধীন ২০১৫ সালেও প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সে সময় হজ নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করায় তৎকালীণ মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিস্কার করে তার এমপি পদ শূন্য ঘোষণার জন্য স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদ থাকা না থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে চিঠি পাঠিয়েছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি।
চিঠিতে বলা হয়েছিলো- ২০১৪ সালে ২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় দলের গঠনতন্ত্রের ৪৬ (ক) এবং (ঞ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীরকে প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে চূড়ান্তভাবে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত হয়। যেহেতু তার আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ নেই, সেহেতু তাকে জাতীয় সংসদ সদস্য পদেও বহাল রাখা সমীচিন হবে না। এক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬ (৪) দফা ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৮ বিধি অনুযায়ী টাঙ্গাইল-৪ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকীর আসন সম্পর্কিত বিতর্ক নিষ্পত্তি করতে বলেছিলেন স্পিকার। তবে শুনানি শেষে রায় ঘোষণার ঠিক আগে আগে লতিফ সিদ্দিকী নিজেই এমপি পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে সে অনুযায়ী, রায় দেন কমিশন।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, জামায়াতের চিঠি আমরা এখনো পাইনি। তবে গণমাধ্যমে দেখেছি তারা চিঠি দেবে। চিঠি আসুক, তারপর আমরা দেখি। সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ না নাকি সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী স্পিকার থেকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি আসে, আমাদের সেটাও দেখতে হবে।
সোমবার (২০ জুলাই) রাতে এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত’ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। নৈতিক স্খলনের কারণে তাকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বহিষ্কার করে।