অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা একটি কঠিন সময় পার করছি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনিয়ম দুর্নীতি ও জালিয়াতির কারণে গর্তে পড়া অর্থনীতি টেনে তোলার সংগ্রামে লিপ্ত বর্তমান সরকার।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের সংকট। এই পরিস্থিতিতে বিগত সময়ের পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের দিকে এগোচ্ছে বিএনপি সরকার।’
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সচিবালয়ের মাল্টিপারপার্স হলে অনুষ্ঠিত গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নিয়ে প্রথমেরই বঞ্চিত মানুষদের সাপোর্ট দেওয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি।ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড এই সাপোর্টের অংশ। এর মাধ্যমে আমরা অর্থনীতিতে সরাসরি অন্তর্ভূক্ত নন এমন ব্যক্তিদের সুবিধা দিয়ে তাদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা করছি।
‘যে কামার-কুমার বা তাঁতীরা এত সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হয়েও অর্থনীতিতে বড় ধরনের কোনো অবদান রাখতে পারছে না, তাদের জন্য আমরা কিছু করতে চাই। এটাকে আমরা বলছি ক্রিয়েটিভ ইকোনমি,’ যোগ করেন অর্থমন্ত্রী।
এসময় অর্থমন্ত্রী ‘সিরিয়াস ডিরেগুলেশন’-এর কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। যা তিনি জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকেই বলে আসছেন। তিনি অতীতেও এ বিষয়ে বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে অর্থনীতির অনেক খাতেই সিরিয়াস ডিরেগুলোশন বাস্তবায়ন করবে।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহজ করতে চাই। এখানে একটি রেস্টুরেন্ট করতে অনেকগুলো লাইসেন্স নিতে হয়। এভাবে কোনো ব্যবসা হয় না। আমরা চাই এই কাজটি সহজ করে আনতে।’
এক প্রশ্নের জবাবে পুঁজিবাজারের বড় ধরনের উন্নয়নের আশাবাদ ব্যক্ত করে আমির খসরু বলেন, সরকার বেসরকারি খাত থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার পক্ষপাতি না। অতীতে যারা এধরনের ঋণ নিয়েছে তারা অনেক বড় বোঝা রেখে গেছেন।
সরকারের ঋণের জন্য ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটা সম্ভব হলে উচ্চ সুদ পরিশোধ না করে আমরা সেই টাকা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে পারবো।
তিনি আরও বলেন, অতীতে পুঁজিবাজারের পতনের কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে সেখানে অনেক বেশি সুদ দিতে হয়। ব্যাংকগুলোও স্বল্পমেয়াদী আমানত সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নে গিয়ে বিপদে পড়ে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা এটা থেকে বের হতে চাই। আমরা চেষ্টা করছি পুঁজিবাজারের বড় ধরনের উন্নয়ন ঘটাতে। এটা সামনে দেখতে পাবেন। গ্যামলিংয়ের কারণে এই বাজারকে ক্যাসিনো মনে করে অনেক ভালো কোম্পানি, একারণে তারা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী না। এখানে ভালো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ছাড়া পুঁজিবাজার সামনে এগোবে না। আমরা চেষ্টা করছি। সামনে একটি বড় পরিবর্তন এই খাতে দেখতে পাবেন।’
বিদেশে সরকারি কাজে পুঁজিবাজার থেকে ঋণ নেওয়ার উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাইরের দেশে মিউনিসিপালের কাজ করতে তারা পুঁজিবাজার থেকে টাকা তোলে। আমরা এই ব্যবস্থা করতে পারলে সরকারের তহবিল থেকে সুদ পরিশোধের চাপ কমবে। সেই অর্থ আমরা অগ্রাধিকার খাতে ব্যয় করতে পারবো।
অনলাইন পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন চালুর দাবী
প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠানে দেশের প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা আসন্ন বাজেটে কি ধরনের রাজস্ব নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার সে বিষয়ে মতামত দেন।
তাদের মধ্যে কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, বাংলানিউজের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু, চ্যানেল আই-এর বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।
হাসান হাফিজ কবি-সাহিত্যিকদের সম্মানী বাবদ প্রদেয় লেখক বিল থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার ও সন্মানী বিল বৃদ্ধির দাবি করেন।
বাংলানিউজের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ২০২০ সাল থেকে দেশে অনলাইন সংবাদপত্রকে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে নিবন্ধন দেওয়া শুরু হয়েছে। এ জন্য অনলাইন সংবাদপত্রগুলোকে নিবন্ধন ফি দিতে হয়। কিন্তু এর বিপরীতে অনলাইন পত্রিকাগুলো কোনো বিজ্ঞাপন সুবিধা পায় না। ছাপা পত্রিকার মতো অনলাইন পত্রিকাগুলোকে বিজ্ঞাপন নীতিমালার আওতায় আনতে পারলে অনলাইন পত্রিকাগুলোরও বিজ্ঞাপন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ছাপা পত্রিকার সার্কুলেশনের বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কম সার্কুলেশনের পত্রিকাও বেশি রেটে সরকারি বিজ্ঞাপন নিচ্ছে বলে আমরা পত্রপত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে অনেক অভিযোগ পাই। তবে অনলাইন পত্রিকার ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে এর পাঠক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।’ সেই তথ্যের ভিত্তিতে যে অনলাইন পত্রিকার পাঠক যেমন সেই অনুপাতে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রস্তাব করেন তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু।
ডিবিসি নিউজের বার্তা প্রধান লোটন একরাম বলেন, কাগজের পত্রিকায় বিভিন্ন দিবসে সরকারের বেশ কিছু ক্রোড়পত্র বিজ্ঞাপন আকারে ছাপা হয়। অথচ টেলিভিশনে একই বিষয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই। টেলিভিশন ও অনলাইন পত্রিকাগুলোকে তাই সরকারি বিজ্ঞাপন নীতিমালার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রীকে রাখা দরকার ছিল বলে মনে হচ্ছে। তার সঙ্গে পরামর্শ করে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান নেবো।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান প্রমুখ।
সরকারি কোম্পানির শেয়ার অফলোড
অনুষ্ঠানে সরকারি তালিকাভুক্ত ২১টি কোম্পানির শেয়ার অফলোডের বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় কিনা সে বিষয়েও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারের শেয়ার থাকার দরকার আছে। তবে যেসব প্রকল্পের ব্যয় ইতোমধ্যে উঠে এসেছে যেমন যুমনা সেতু, এ ধরনের প্রকল্পকে সিকিউরিটাইজ করে যদি কিছু অর্থ পাওয়া যায় তাহলে সরকারের ঋণের বিকল্প সংস্থান হবে।

পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্তির জন্য করের ব্যবধান বাড়ানোর প্রস্তাব
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন প্রাসঙ্গিক সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। এসময় বাংলানিউজের সম্পাদক পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানি প্রাতিষ্ঠানিক কর ব্যবধান বাড়ানোর প্রস্তাব করলে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক করের ব্যবধান আগে ছিল ৫ শতাংশ। আমরা এটাকে ৭.৫ শতাংশ করেছি। এ ব্যবধান আরও বাড়ানো যায় কি না আমরা চিন্তা করে দেখবো।
আয়কর ফাঁকি রোধে ডিজিটাইজেশনের পথে এনবিআর
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা আয়কর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটাজেশন করতে চেষ্টা করছি। এটা করা গেলে কর ফাঁকি কার্যকর ভাবে রোধ করা যাবে।
এক প্রশ্নের জবাবে অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার বাড়লেও এর মূলধনী বিনিয়োগ আগের মতোই থাকবে। এই বাজেট নিয়ে আমরা আশাবাদী।
এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ বিষয়। আমরা চেষ্ঠা করছি ‘স্টোলেন অ্যাসেট’ সনাক্ত করে সেগুলো যে দেশে আছে সেখানে জব্দ করে রাখা যায় কি না।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে গভর্নর বলেন, ব্যাংক খাতের আমানতের এক তৃতীয়াংশ খেলাপি ঋণ। এই ঋণগুলোকে প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণ বলা মুশকিল। এগুলো আসলে চুরি। এই ঋণগুলো অনেকটারই যথাযথ নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। আদায়যোগ্য জামানত রাখা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি টাকা ছাপিয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে ঋণ দেওয়ার যে সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে তা সঠিক নয়। সরকার নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করায় বরং নিট ঋণ আরও কমেছে।
একইদিন অর্থবিভাগের সভাকক্ষে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও এর সদস্যদের সঙ্গেও প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। সেখানেও প্রায় একই ধরনের আলোচনা উঠে আসে। আসন্ন বাজেটে এসএমই খাতের জন্য আলাদা রাজস্ব নীতিসহ বেশ কিছু সুস্পষ্ট দাবী তুলে ধরে সংগঠনটি।