বর্তমানে বাংলাদেশ জনসংখ্যাগত সুবিধা ভোগ করছে। একইসঙ্গে জনসংখ্যা বাড়ার হার তুলনামূলকভাবে নিম্নমুখী, যা বর্তমানে ১.৩৩ শতাংশ।২০৩৪-৩৫ সালের পর এই সুবিধা হ্রাস পেতে পারে-তাই এখনই উৎপাদনশীল সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজধানীর বনানীতে ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস: বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)।
মূল প্রবন্ধে পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে গেছে।বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশে নেমে এসেছে এবং গত পাঁচ মাসে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি দ্বি-অঙ্কে পৌঁছেছে, যা আর্থিক খাতে আস্থার আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পুনরুদ্ধার কিছু মৌলিক দুর্বলতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশে পৌঁছানোয় আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমেছে। পাশাপাশি রাজস্ব সক্ষমতার ঘাটতির কারণে সরকার উচ্চ সুদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নও নিতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে তিনটি সমসাময়িক বহিরাগত চাপের মুখে-মধ্যপ্রাচ্য সংকট, আসন্ন এলডিসি উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা। এসব চাপ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহের দুর্বলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের মাধ্যমে অর্থনীতির সর্বস্তরে প্রভাব ফেলছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সতর্ক, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা—যেখানে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে বিচক্ষণতা অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত করতে পারে। একইসঙ্গে কাঠামোগত সংস্কারকে কেবল আইএমএফের শর্ত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেসব দেশ এই ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই এখন সেই নিয়ম লঙ্ঘন করছে-ফলে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা সম্ভবত একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, যা আরও বহুমুখী এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হলে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত বর্তমানে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো, যা একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা। জ্বালানির পাশাপাশি সার ও খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
আইএমএফ কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চূড়ান্ত কিস্তি প্রাপ্তি নির্ভর করছে বিনিময় হার সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ওপর। যদিও বৈদেশিক খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে এখনও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে, অন্যদিকে আমদানি প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ৭-৮ শতাংশ আমদানি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, কারণ আমদানি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির জন্য অপরিহার্য উপকরণ সরবরাহ করে।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ডেপুটি হেড অব মিশন ক্লিনটন পবকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বেশিরভাগ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ‘আত্মসৃষ্ট’ এবং সেগুলো মোকাবিলায় সাহসী, দেশীয় উদ্যোগে পরিচালিত সংস্কার জরুরি।
ড. বজলুল হক খন্দকার বলেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কেন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হচ্ছে না, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা জরুরি, যাতে রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ে এবং আর্থিক পরিসর সম্প্রসারিত হয়।