জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে কখনো চিন্তা করা হয়নি: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে কখনো চিন্তা করা হয়নি: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, বাংলাদেশে কখনো জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করা হয়নি। আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে কোনো জ্বালানি নিরাপত্তা পাইনি।বরং যা ছিল, তা কমেছে।

বুধবার (৮ এপ্রিল) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রভাব প্রশমন’ শীর্ষক সেমিনারে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে কখনো জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা হয়েছে এর আগে? অনেক বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে। কিন্তু আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে কোনো জ্বালানি নিরাপত্তা পাইনি।বরং যা ছিল, তা কমেছে। আমরা অনেক বয়ান শুনেছি।আমরা হাতিরঝিলে বিদ্যুৎ জ্বালিয়ে বলেছি, এত শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছি। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে একটি সূচক যদি আমাকে দেখাতে পারেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেও সরকার স্বচ্ছতা ও সংস্কারের পথে রয়েছে জানিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। বিগত সরকারগুলোর রেখে যাওয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির মধ্যেও সরকার উত্তরণের চেষ্টা করছে। দেশে বর্তমানে ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এসব চাপের মধ্যেও সরকার স্বচ্ছতা বজায় রেখে পরিকল্পিত পুনরুদ্ধারের পথে এগোতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হওয়ায় জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, যা আগের সরকারগুলোর তুলনায় ভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

জ্বালানি পরিস্থিতি প্রসঙ্গে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছিল না। ইস্টার্ন রিফাইনারির কৌশলগত মজুত এক সময় ৩০ দিনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও তা এখন কমে ১৭ দিনে নেমে এসেছে।

তিনি পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, তারা স্বজনপ্রীতিমূলক পুঁজিবাদকে সুবিধা দিতে দাম বাড়িয়েছে, কিন্তু জনস্বার্থে যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার একটি সমন্বিত জ্বালানি কৌশল গ্রহণ করেছে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বয়ে উৎস বৈচিত্র্য আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, জ্বালানি আমদানি ও বাণিজ্য অর্থায়ন স্থিতিশীল রাখতে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থা থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

ছবি: মুজিবুর

তিতুমীর জানান, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে ১ লাখ ৩৮ হাজার টন ডিজেল এবং ৭১ হাজার টন অকটেন সরবরাহ প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

বৃহত্তর অর্থনীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংকটকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে, যেমনটি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের সময় কৌশলগত বাস্তবতা প্রয়োগ করে করা হয়েছিল। দারিদ্র্য বেড়ে অতিরিক্ত ৯০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরকার সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, যা সরকার গঠনের ২৩ দিনের মধ্যে চালু করা হয়েছে। কৃষিখাতেও সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১৪ এপ্রিল চালু হতে যাওয়া নতুন কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ১০ ধরনের সেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরও জানান, একই সঙ্গে সরকার শিল্পখাতে বৈচিত্র্য আনার ওপর জোর দিচ্ছে এবং কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প, ওষুধ, চামড়া, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পরিবেশগত বিষয়ও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। নগরীর বায়ুদূষণ কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানিতে শূন্য শুল্ক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ঢাকার মতো শহরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিতুমীর বলেন, সংকট সম্পর্কে জাতীয় ঐকমত্য এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সরকারকে শক্তি জোগাচ্ছে, যার মাধ্যমে সহনশীলতা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে।

সেমিনারে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইস্টেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন, বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক খান এবং বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির।

সেমিনারে অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন ‘জ্বালানির মূল্য, উৎস এবং কৌশলগত মজুদ’, ইনামুল হক খান ‘বাণিজ্য ও বাজার বৈচিত্র্যকরণ’ এবং ড. মাহফুজ কবির ‘মুদ্রাস্ফীতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয় ও পুনরুদ্ধার’ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS