বর্ণিল রঙে রাঙানো দেয়াল, তাতে শিল্পকর্মের ছোঁয়া। দেয়ালজুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে লোকজ ঐতিহ্য। নানা রকম গাছপালা আর দামি শোপিস দিয়ে সাজানো ভবনটির ভেতরে ও বাইরে। বিলাসবহুল এই আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের স্থাপত্যশৈলীও বাইরে থেকে নজরকাড়া। আভিজাত এ ভবনটি বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকার। জলেশ্বরীতলার মতো এমন অনেক বহুতল দালানকোঠা চোখে পড়বে প্রাচীন শিল্পশহর বগুড়াজুড়ে।
গত দুই দশকে ৬ তলা থেকে ১৮ তলা পর্যন্ত এসব দালানকোঠা যেন বগুড়ায় আকাশছোঁয়ার চেষ্টা করছে। শহরটিতে এখন আছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক—দুই ধরনের বহুতল ভবন। এসব ভবন নির্মাণের কর্মযজ্ঞকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে দাঁড়িয়ে গেছে সম্ভাবনাময় আবাসন ব্যবসাও। দুই দশকে আবাসন খাতে বিনিয়োগ হয়েছে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা। যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ২০ হাজার মানুষের।
প্রাচীনকাল থেকেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শহর বগুড়া। পৌরাণিক প্রেমকাহিনি ‘বেহুলার বাসরঘর’ এবং প্রাচীন রাজধানী ‘পুণ্ড্রনগর’ বগুড়ার বর্তমান শহর থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে, গোকুল মেধ ও মহাস্থানগড়ে।
পুণ্ড্রনগর প্রায় ১ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাল রাজাদের হাতে রূপ পেয়েছিল এক সুবিন্যস্ত ও সংগঠিত নগররূপে। এ সময়েই পুণ্ড্রনগর এক স্থাপত্যবিস্ময়ে পরিণত হয়। নগরের কেন্দ্রে ছিল প্রশাসনিক কাঠামো, রাজপ্রাসাদ, কর সংগ্রহ কেন্দ্র ও ধর্মীয় মঠ। বিলীন হওয়া আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার বসতির ধ্বংস চিহ্নের ছাপ মেলে এখনো এই জনপদে।
ব্রিটিশ সরকার ১৮৭৬ সালে বগুড়া পৌরসভা গঠন করে। তারও আগে ছিল ‘টাউন কমিটি।’ ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২১টি ওয়ার্ডের এই শহরে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস।
ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণেই বহু আগে থেকে বগুড়ার পরিচিতি ধনীদের শহর হিসেবে। যোগাযোগব্যবস্থা, কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য মিলিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ থাকায় প্রতিনিয়ত এখানে বিভিন্ন জেলার মানুষ আসছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের থাকার জন্য দরকার পড়ছে নতুন নতুন বসতির।
তিন দশকে আবাসন–বিপ্লব

১৯৭০ সালের দিকে বগুড়া শহরের বসতি বলতে ছিল মাটির ঘর এবং চুন-সুরকির আধা পাকা একতলা বাড়ি। ২০০০ সালেও শহরে বহুতল দালান ছিল না বললেই চলে। ২০০৫ সালে বগুড়া শহরে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং শহরের রাস্তাঘাট প্রশস্ত হওয়ার পর বহুতল দালানকোঠা গড়ে উঠতে শুরু করে।
বগুড়া পৌরসভার রেকর্ডে থাকা তথ্যানুযায়ী, শহরে আবাসিক বসতিসংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। অনুমোদিত নকশায় নির্মিত ছয়তলা পর্যন্ত ভবনের সংখ্যা ৯ হাজার। নকশাবহির্ভূত ভবন আছে আরও পাঁচ হাজার। এই ১৪ হাজার বহুতল বসতি ছাড়াও ৭–৮ তলাবিশিষ্ট অনুমোদিত নকশায় নির্মিত ভবনের সংখ্যা তিন শতাধিক। নকশাবহির্ভূত এই উচ্চতার ভবন আছে আরও ১২০টি। ১০ থেকে ১৮ তলাবিশিষ্ট অনুমোদিত বহুতল ভবন আছে ১৭টি, অননুমোদিত আছে ১০টি। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট নকশা অনুমোদন কমিটি আরও ৬৩টি বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। এই অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যে কারণে নতুন অনুমোদন দেওয়া ভবনগুলো আবার যাচাই–বাছাই করা হবে বলে জানা গেছে।
বগুড়া পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, শহরের জলেশ্বরীতলা, সূত্রাপুর, ঠনঠনিয়া, মালতিনগর, রহমাননগর, জামিলনগর, চকসূত্রাপুর, খান্দার, সেউজগাড়ি, জহুরুলনগর, উপশহর, কালীতলা, শিববাটি, চেলোপাড়া, বউবাজার, বৃন্দাবনপাড়া, ফুলবাড়ী, জয়পুরপাড়া, বাদুরতলা, কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে।
বগুড়া রিয়েল এস্টেট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, ‘গত ২০ বছরে বগুড়ায় আবাসন খাতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। শতাধিক ব্যবসায়ী এ খাতে বিনিয়োগ করেছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শহরজুড়ে আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবন নির্মাণের শতাধিক প্রকল্প চলমান।’
সরকার বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে। সিটি করপোরেশন ঘোষণা হলে আবাসন খাতে সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। মূল শহরের বাইরেও নতুন বসতি এলাকা গড়ে উঠবে। এ খাতে আরও হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা।
আবাসন ব্যবসায় যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবাসন খাতে গুরুত্বের বিবেচনায় দেশের মধ্যে ৪ নম্বর অবস্থানে রয়েছে বগুড়া। ঢাকার পরের অবস্থান বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রামের। তৃতীয় স্থানে ব্যবসায়িকভাবে শক্ত খুঁটি তৈরি করতে পেরেছে ‘লন্ডনখ্যাত’ সিলেট। এরপরই রয়েছে বগুড়ার অবস্থান।

পাখির চোখে বগুড়া
প্রায় তিন দশকে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরকে পেছনে ফেলে বগুড়ার আবাসন খাত ঊর্ধ্বগতিতে এগিয়ে চলেছে। বগুড়ায় বহুতলবিশিষ্ট দালানকোঠা বা অত্যাধুনিক বসতি গড়ে তোলার কর্মযজ্ঞ শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বগুড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ময়েজ মিয়ার হাত ধরে।
শহরের কামারগাড়ি এলাকায় ‘রেডি লাইট’ আবাসিক প্রকল্পের মাধ্যমে বগুড়ায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। এরপর তারা উপশহরে স্নিগ্ধা আবাসিক প্রকল্পসহ বেশ কিছু বহুতল ভবন গড়ে তোলে। ১৯৯৯ সালের দিকে শহরের জলেশ্বরীতলা কালিবাড়ী মন্দির এলাকায় ট্রপিক্যাল বিল্ডিং টেকনোলজিস লিমিটেড গড়ে তোলে এলাকার প্রথম বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ‘গুলমোহর’।
২০০০ সালের পর শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকায় নিজস্ব জায়গায় বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ‘ডলফিন টাওয়ার’ নির্মাণ করেন প্রবাসী এক ব্যবসায়ী।
এভাবেই ধীরে ধীরে বগুড়ার আবাসন ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। শহরের সূত্রাপুর ও জলেশ্বরীতলায় একের পর এক বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট গড়ে ওঠে। নতুন নতুন প্রকল্পে যুক্ত হয় ট্রপিক্যাল হোমস লিমিটেড, অ্যামিকাস প্রোপার্টিজ, কমফোর্ট হাউজিংসহ বেশ কয়েকটি আবাসন প্রতিষ্ঠান।
এ সময় ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান শহরের বৃন্দাবনপাড়া এলাকায় প্রথম বাণিজ্যিক বহুতল ‘জীবনবিমা ভবন’ নির্মাণ করে। এরপর একে একে আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে গাজী রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, রূপকথা হাউজিং, শম্পা প্রোপার্টিজ লিমিটেড, ইজি হোমস লিমিটেড, ট্রপিক্যাল বিল্ডিং টেকনোলজিস লিমিটেড, মেধা কনস্ট্রাকশন, বিসিএল কনস্ট্রাকশন, অ্যাবকন প্রোপার্টিজ, লোকালয় প্রোপার্টিজ, ডিকেন্স প্রোপার্টিজ, ইনল্যান্ড প্রোপার্টিজ, ডাইম প্রোপার্টিজ, ইয়সিন হোল্ডিং, বগুড়া ড্রিম, ল্যান্ড সেলস অ্যাড ডেভেলপমেন্ট, এমআর ব্রাদার্স, স্থপতিয়া প্রোপার্টিজ লিমিটেড, স্কাই টাচ, রানার প্রোপার্টিজের মতো বেশ কিছু রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান।
আবাসন ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে শহরের জলেশ্বরীতলা, মালতিনগর, রহমাননগর, বকশিবাজার, সূত্রাপুর, ঠনঠনিয়া, কলোনি, বাদুরতলা, শিববাটি, কাটনারপাড়া, কালীতলা, ফুলবাড়ী, জয়পুরপাড়া, মাটিডালি, উপশহর, জামিলনগর, জানে সাবা হাউজিং, রানার সিটির মতো এলাকায়।
অল্প সময়ে এসব এলাকায় কয়েক হাজার আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। বগুড়ার আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটগুলোর আয়তন সাধারণত ১ হাজার ৫০ বর্গফুট থেকে ২ হাজার ৩০০ বর্গফুট পর্যন্ত।
শুরুর দিকে নির্মাণ খরচ কম থাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকায়। সময়ের ব্যবধানে এলাকাভেদে এখন প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার টাকায়। আবাসন খাতে এখানে বর্তমানে শতাধিক ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করেছেন। সবচেয়ে বেশি অ্যাপার্টমেন্ট গড়েছে গাজী রিয়েল এস্টেট কোম্পানি লিমিটেড।

বহুতল বসতি নির্মাণে শহরের সঠিক মাস্টারপ্ল্যান থাকা দরকার
পৌরসভার অনুমোদন ছাড়াই বগুড়া শহরে গড়ে উঠেছে অনেক বহুতল ভবন। বেশির ভাগ ভবন নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, ট্রাফিক পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিভাগের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি।
বগুড়া পৌরসভার নগর–পরিকল্পনাবিদ আল মেহেদী হাসান বললেন, ‘শহরে কয়েক শ অনুমোদনহীন নকশার ভবন তৈরি হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় পৌরসভা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী জরিমানা, নকশার অনুমোদন বাতিল, নেসকোকে (বিদ্যুৎ বিভাগ) বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান না করার পত্র প্রদান, জেলা রেজিস্ট্রারকে অননুমোদিত ভবনের দলিল না করার জন্য পত্র প্রদান করা হয়ে থাকে। পৌরসভায় বছরে গড়ে ১ হাজার ৫০০টি নকশা জমা হয়। প্রতিটি নকশা রেজিস্ট্রারের ক্রমিক অনুযায়ী সরেজমিনে তদন্ত করে সভায় পেশ করা, কার্যবিবরণী প্রস্তুত এবং ফি জমা দিয়ে নকশা অনুমোদনের জন্য কমিটির কাছে পাঠানো হয়।’
বহুতল বসতি নির্মাণে শহরের সঠিক মাস্টারপ্ল্যান বা ‘মহাপরিকল্পনা’ থাকা দরকার জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, শহরজুড়ে তিনতলার অধিক কয়েক হাজার ভবন গড়ে উঠেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পৌরসভা থেকে দোতলা বা তিনতলা পর্যন্ত নকশার অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা পর্যন্ত বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ট্রাফিকব্যবস্থা যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, এ জন্য ভূগর্ভস্থ পার্কিং সুবিধা রাখার শর্তে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকেও ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত শহরে ভূগর্ভস্থ পার্কিং সুবিধা আছে—এমন ভবনের সংখ্যা হাতে গোনা। এ ছাড়া দুর্যোগকালে উদ্ধার তৎপরতায় পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের জন্য প্রতিটি বহুতল ভবনের সামনে প্রশস্ত রাস্তা থাকার কথা থাকলেও বেশির ভাগেরই তা নেই। এতে দুর্যোগকালে ওই সব এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য গাড়ি পৌঁছাতে পারবে না। ফলে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এবং পৌরসভার অনুমোদনহীন এসব বহুতল ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও শহরবাসীর প্রাণ সংশয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগর–পরিকল্পনাবিদের দেওয়া তথ্যমতে, ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও বুয়েটের জরিপ অনুযায়ী, বগুড়া শহরকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনুমোদন না নিয়ে অপরিকল্পিত ও দায়সারা নকশায় নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে শহরে বহুতল ভবন নির্মিত হলে দুর্যোগে বহু প্রাণহানির আশঙ্কা থেকে যায়।