ঈদ মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব। মুসলমানদের কাছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা—এই দুই আনন্দের উৎসব মানে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা। আর এ লক্ষ্যে জীবিকার তাগিদে যে যেখানেই থাকুক না কেন, এই দুটি উৎসবে সবাই ছুটে যায় আপনজন বা পরিবারের কাছে।
রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং ঢাকার আশপাশের কয়েকটি জেলাকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ কর্মসংস্থান গড়ে ওঠায় জীবিকার তাগিদে দেশের একটি বড় অংশের মানুষ এসব শহরে বসবাস করেন।
তাই সরকারি ছুটি উপলক্ষে দুই ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যে এসব কর্মজীবী মানুষ কর্মস্থলের শহরগুলো থেকে নিজ নিজ জেলায় রওনা হন। ঈদের আনন্দ উদযাপনের উদ্দেশ্যে শহরগুলো থেকে একসঙ্গে কয়েক কোটি মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে যাত্রা করেন। প্রচলিতভাবে ঈদের আগের তিন দিন ঘরমুখো মানুষের এই ঢল সামাল দিতে হয় দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে। ঈদের আগের ও পরের তিন দিনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ যাত্রী বেড়ে যাওয়ায় এর চাপ পড়ে গণপরিবহন ও মহাসড়কে।
ফলে সড়কে দূরপাল্লার গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি যানবাহনের ট্রিপ সংখ্যাও বেড়ে যায়। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিবছরই ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা যেন মহাসড়কের এক ধরনের মহামারিতে পরিণত হয়। প্রতিবছর ঈদযাত্রা ও ফিরতি যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের সংখ্যা সারা বছরের মোট সংখ্যার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে।
বিগত কয়েক বছরে সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবীদের, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ঈদের ছুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নির্ধারণ করায় মহাসড়কের চাপ কিছুটা কমলেও তুলনামূলকভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কমেনি।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদযাত্রার সড়ক দুর্ঘটনাগুলো দেশের পরিবহন খাতের দুর্দশা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এসব দুর্ঘটনার পেছনে নানা কারণ থাকলেও চালকদের নির্ঘুম ড্রাইভিং ও শারীরিক ক্লান্তিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ঢাকা থেকে খুলনাগামী ফাল্গুনী-মধুমতি পরিবহনের একটি এসি বাসের নিয়মিত চালক মো. ইব্রাহিম শেখ। বছরের অন্যান্য সময়ে তিনি সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন ডিউটি করেন। যদি এক দিন ও এক রাত টানা ড্রাইভিং করেন, তাহলে পরবর্তী অন্তত এক দিন এক রাত বা দুই দিন বিশ্রামে থাকতে হয়।কিন্তু ঈদযাত্রায় ট্রিপের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং চালকের সংকট থাকায় এবারের ঈদের প্রথম ধাপে তিনি টানা তিন দিন ডিউটি করেছেন।
এই দূরপাল্লার বাসচালক বলেন, ‘ঈদের আগের চার-পাঁচ দিন আমাদের ডিউটি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে শেষ তিন দিন খাওয়া-ঘুমেরও সময় থাকে না। এমনও হয়েছে—ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে খুলনায় পৌঁছে ড্রাইভিং সিট থেকে নামার সুযোগ পাইনি, আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছি। এভাবে চার থেকে ছয়টি ট্রিপ দিলেও ঠিকমতো বিশ্রাম পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাঝেমধ্যে খালি গাড়ি নিয়ে ফেরার সময় কিছুটা পথ হেলপার গাড়ি চালায়, তখন একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। তবে সেটাও সব সময় সম্ভব হয় না।’
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানো হলেও তা বিপুল যাত্রীর চাপ সামলাতে যথেষ্ট নয়। ফলে যানবাহনের ট্রিপ সংখ্যা বাড়াতে হয়। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদের আগে ও পরে ট্রিপ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। কিন্তু এই বাড়তি চাপ সামলাতে চালক বা সহকারীর সংখ্যা বাড়ানো হয় না।
আন্তর্জাতিকভাবে একজন চালকের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথা বিবেচনা করে সাধারণত টানা চার ঘণ্টা ড্রাইভিংয়ের পর অন্তত চার ঘণ্টা বিশ্রামের বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে ঈদযাত্রায় অনেক চালক ও সহকারী টানা তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত নির্ঘুম থেকে কাজ করেন। ফলে গাড়ি চালানোর সময় তারা মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
একদিকে ট্রিপ বাড়ার কারণে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাড়াহুড়ো, অন্যদিকে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাব—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব চালকদের ওপর পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে মিশ্র পরিবহন ব্যবস্থাও বড় ভূমিকা রাখে। দ্রুতগতির দূরপাল্লার যানবাহনের সঙ্গে কম গতির থ্রি-হুইলার, মোটরবাইক ও ইজিবাইকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি যাত্রীর চাপ সামাল দিতে অনেক ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে নামানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে নগর পরিবহনের বাসও মহাসড়কে চলাচল শুরু করে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ায়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. মোসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, ‘আমাদের দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় তেমন উন্নতি হয়নি। যানবাহন আধুনিক হলেও ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আগের দুর্বলতা রয়ে গেছে, যা ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে একজন চালক নির্দিষ্ট সময় পর দায়িত্ব অন্য চালকের কাছে হস্তান্তর করেন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেন। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যয় কমানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে একজন চালক দিয়েই সব ট্রিপ পরিচালনা করা হয়। ঈদের সময় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়।’
অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন মনে করেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিভিন্ন পেশার ছুটি ভিন্ন সময়ে নির্ধারণ করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। প্রয়োজনে পোশাকশ্রমিকদের ছুটি আরও আগে দেওয়া এবং কাজে ফেরার সময় বাড়ানো হলে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু ঈদের সময় নয়, সারা বছর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। দক্ষ চালক নিয়োগ, তাদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের ফিটনেস কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে হবে।’
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘ঈদ এলেই সবাই সড়কের অবস্থা নিয়ে চিন্তিত থাকেন, কিন্তু যানবাহনের ফিটনেস ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না। অথচ অনেক দুর্ঘটনা ভালো সড়কেই ঘটে, যা প্রমাণ করে সমস্যা সড়কে নয়, যানবাহন ও ব্যবস্থাপনায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি যানবাহনের ফিটনেস ও সঠিক ব্যবস্থাপনার দিকে জোর দিলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।’